উদ্ধার করা হয় ধ্বংসস্তূপ থেকে

সপ্তাহের ব্যবধানে দুবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরেন মোজতবা খামেনি

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দু-দুবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত প্রথম হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তার ছেলে মোজতবা খামেনি। ওই হামলায় আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত তেহরানের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানেও পিছু ছাড়েনি মৃত্যুভীতি। পরবর্তীতে সেই হাসপাতালেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী ভয়াবহ বোমা হামলা চালালে দ্বিতীয়বারের মতো তাকে ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে বের করতে হয়েছিল’।

চলতি সপ্তাহে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ‘আল আরাবি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই তথ্য প্রকাশ করেছেন ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের (বিশেষজ্ঞ পরিষদ) সদস্য মহসেন হায়দারি।

২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে আলী খামেনির মূল বাসভবনে হামলা চালিয়ে ৮৬ বছর বয়সী এই শীর্ষ ধর্মীয় নেতাসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রধানকে হত্যা করা হয়, যার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। প্রতিবেদনে জানা যায়, ওই হামলার পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথবাহিনী তেহরানের অন্তত তিনটি হাসপাতালে বোমাবর্ষণ করে।

মহসেন হায়দারি বলেন, ‘তিনি (মোজতবা) আহত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেও তেহরানের তিনটি হাসপাতালে হামলা চালানো হয়েছিল। মোজতবা খামেনি তৃতীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং তাকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে টেনে বের করা হয়েছিল।’ হাসপাতালের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের পর মোজতবা খামেনিকে এক অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তাকে আর জনসম্মুখে দেখা যায়নি, এমনকি তার কোনো বক্তব্যও প্রকাশিত হয়নি।

এমনকি গত ৮ মার্চ রাষ্ট্রীয় টিভিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার নাম ঘোষণা করার আগপর্যন্ত মোজতবা খামেনি নিজেও জানতেন না যে তাকে দেশের সর্বোচ্চ পদে মনোনীত করা হয়েছে। তবে ঘোষণার পর দেশীয় আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী এই দায়িত্বভার গ্রহণ করা তার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল বলেও জানান হায়দারি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। কোমে অবস্থিত সংস্থাটির সচিবালয়ে বোমা হামলায় আটজন নিহত হন এবং নতুন নেতা নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্ত নথি ও সুপারিশ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ফলে প্রথম দফার বিমান হামলার এক সপ্তাহ পর, যেকোনো ঝুঁকি এড়াতে সদস্যদের অত্যন্ত গোপনে এক বিশেষ কক্ষে ডেকে পাঠানো হয়। সভার স্থান বা উদ্দেশ্য আগে থেকে না জানিয়ে সদস্যদের পৃথক ব্যালট কাগজে নিজেদের পছন্দ লিখতে বলা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, প্রয়াত খামেনির ছেলেকে যেন কোনোভাবেই নেতা নির্বাচন না করা হয়, কারণ তিনি তার বাবার চেয়েও বেশি শক্ত অবস্থানের ও গোঁড়া মনোভাবের। কিন্তু ট্রাম্পের সেই হুমকি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ভোটাভুটির সময় মহসেন হায়দারিই প্রথম মোজতবা খামেনির নাম প্রস্তাব করেন। হায়দারি বলেন, ‘শত্রুর হুমকি ও অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ছাড়া আমরা আর কাউকেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে বেছে নেব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মোজতবা খামেনির সুস্থতা এবং নেতৃত্ব দিতে সক্ষম থাকার বিষয়ে আমরা আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্য পাই। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার সকল শর্ত তিনি পূরণ করেছেন।’ গোপন ওই ভোটাভুটিতে মোট ৫৯টি ভোটের মধ্যে ৫০টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন মোজতবা খামেনি। অপর প্রার্থী আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি পান ৮টি ভোট এবং পরিষদের এক সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে মোজতবা খামেনি ইরানি প্রশাসনের সরাসরি কোনো সরকারি বা রাজনৈতিক পদে ছিলেন না; তবে তিনি তার বাবার অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। সাক্ষাৎকারে তাকে ‘ম্যান অব দ্য শ্যাডও' বা নেপথ্যের পরিচালক বলে আখ্যা দেন হায়দারি।

গত কয়েক মাস ধরে মোজতবা খামেনির স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হামলায় তিনি গুরুতর জখম হয়েছেন এবং তার চেহারা বা শরীর বিকৃত হয়ে গেছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মোজতবার শারীরিক অবস্থা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি মনে করি না তিনি মারা গেছেন। তবে তিনি মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। তার শরীরের বাম পাশ, হাত, পা-পুরোটাই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।’

তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে চলতি সপ্তাহে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সব জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ‘সম্পূর্ণ সুস্থ’ আছেন।