মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে বিতারিত করা হবে: ইরানের সেনাপ্রধান

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উপস্থিতি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না দাবি করে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি বলেছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অঞ্চল থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তার দাবি, এই পরিবর্তন এখন আর খুব দূরের বিষয় নয়।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর এক সমাবেশে এসব মন্তব্য করেন হাতামি। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। হাতামি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। তার ভাষায়, ‘হরমুজ প্রণালি আমাদের সম্মানের প্রণালি’ এবং দেশের শত্রুদের এই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ ব্যবহারের সুযোগ ইরান দেবে না।

হাতামি বলেন, ইরান বহুবার জানিয়েছে- মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি অংশ অনিরাপদ হলে সেই অনিরাপত্তা পুরো অঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, ইরান যদি বাণিজ্য করতে না পারে এবং স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে না পারে, তাহলে অন্যদের পক্ষেও এই অঞ্চলে নিরাপদে বাণিজ্য ও জীবনযাপন করা সম্ভব হবে না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইরানের সেনাপ্রধান মূলত হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের বিরুদ্ধে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

প্রতিবেশীদের প্রতি হাতামির বার্তা
ইরানের সেনাপ্রধান মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করলেই যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে দেশগুলো তা দেখেছে। হাতামির ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ‘জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা’কে অঞ্চল থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তিনি দাবি করেন, এই পরিবর্তন ‘খুব দূরের বিষয় নয়’। এটি ইরানের সামরিক নেতৃত্বের রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যায়ন। এর অর্থ বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে যাবে, এমন কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্বাভাস নয়।

হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেল, গ্যাস, পরিবহন ও বিমা ব্যয়সহ বৈশ্বিক বাজারে এর প্রভাব পড়ে। চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে তাই হরমুজ শুধু একটি নৌপথ নয়, বরং বড় ধরনের কৌশলগত দর-কষাকষির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

তেহরান এরই মধ্যে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ ও নৌ অবরোধ শিথিল করলে হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা সম্ভব। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় থাকার কথাও জানিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানিয়েছেন। ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করে সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক দর-কষাকষি দুই প্রক্রিয়াই পাশাপাশি চলছে।

যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি
হাতামির সর্বশেষ বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট- তেহরান সংঘাতকে এখনো পুরোপুরি সমাপ্ত হিসেবে দেখছে না। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে ইরানের সেনাপ্রধান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চাপানো যুদ্ধ এখনো ‘গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক পর্যায়ে’ রয়েছে। তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীকে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে হরমুজ নিয়ে ইরানের অবস্থান কেবল অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার অংশ নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলও যুক্ত হয়েছে।

হাতামির বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ্য হুমকি-পাল্টা হুমকির পাশাপাশি পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে। তেহরান বলছে, চাপের মুখে তারা নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ থেকে সরে যাবে না। ওয়াশিংটন আবার ইরানের ওপর চাপ বজায় রেখেই হরমুজে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। ফলে বর্তমান সংকটের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- হরমুজকে ঘিরে দুই পক্ষের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কতদূর যাবে এবং কূটনৈতিক সমঝোতার জন্য তারা কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত হবে।

জেএম
আরও পড়ুন