স্থলবাণিজ্যে ঝুঁকছে ইরান, তুরস্ক সীমান্তে ট্রাকের দীর্ঘ সারি

সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় স্থলসীমান্ত দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান। কিন্তু হঠাৎ করে স্থলবাণিজ্যের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় তুরস্ক সীমান্তে তৈরি হয়েছে তীব্র যানজট। কিলোমিটারের পর কিলোমিটারজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে পণ্যবাহী ট্রাক। কোথাও কয়েক দিন, আবার কোথাও দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।

তুরস্কের সঙ্গে ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক সীমান্ত গুরবুলাক-বাজেরগান এখন দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো দিয়ে বাণিজ্য সীমিত হওয়ায় উত্তর ও পূর্বের স্থলপথের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

বর্তমান পরিস্থিতির আগে ইরানের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি উপসাগরীয় সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ ফারজানেগানের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এখন সেই বাণিজ্যের একটি অংশ তুরস্ক ও পাকিস্তানের সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে তেহরান। তুরস্কের পথটি ইরানকে ইউরোপের সঙ্গে এবং পাকিস্তানের সীমান্তপথ এশিয়ার অন্যান্য বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে।

কিন্তু স্থলপথ সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি কাজ করতে পারছে না। সীমিত অবকাঠামো, কাস্টমস প্রক্রিয়া, সীমান্ত তল্লাশি ও পরিবহন সক্ষমতার ঘাটতি এর বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদ ফারজানেগানের মতে, স্থলপথের সক্ষমতা সমুদ্রবাণিজ্যের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করার মতো নয়।

তুরস্ক সীমান্তের পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায় ট্রাকের সংখ্যাতেই।

ইরানের বাণিজ্য উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট একটি সরকারি সংস্থার উপপ্রধান আমির রোশানবখশ গানবারি জানিয়েছেন, আগে সীমান্তে যেখানে প্রায় ২০০টি ট্রাক থাকত, সেখানে এখন সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, গন্তব্য দেশের সীমান্ত অবকাঠামো একসঙ্গে এত ট্রাক সামাল দেওয়ার মতো সক্ষম নয়। পরিস্থিতি কত দিন চলবে, তা স্পষ্ট না হওয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোর পক্ষ থেকেও বড় পরিসরে অবকাঠামো সম্প্রসারণে অনীহা রয়েছে।

তুরস্কের আন্তর্জাতিক পরিবহন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর গুরবুলাক সীমান্তে ট্রাকের অপেক্ষার সময় চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।

সীমান্তে প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রাকের সারি দেখা গেছে। এক চালক জানিয়েছেন, আগে সর্বোচ্চ তিন দিন অপেক্ষা করতে হলেও এখন পাঁচ দিন বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ইরানের দিকের সীমান্তে পরিস্থিতি আরও কঠিন বলে চালকদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

কিছু চালকের দাবি, গত এক মাসে ইরানের কাস্টমস এলাকায় অপেক্ষার সময় ১২ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত হয়েছে। পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারিতে আটকে থাকায় পরিবহন খরচ বাড়ছে, কমে যাচ্ছে ট্রাকচালকদের আয় এবং একটি ট্রিপ শেষ করতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।

ইরানের তাবরিজের এক ট্রাকচালক জানান, আগে তিনি মাসে দুইবার যাতায়াত করতে পারলেও এখন দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে একবারের বেশি যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর দাবি, এতে আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ইরানে ট্রাকের জ্বালানি ব্যয়ও বেড়েছে।

আরেক চালক সীমান্তে দীর্ঘ অপেক্ষার সময় মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবের কথাও জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক জায়গায় চালকদের জন্য পর্যাপ্ত শৌচাগার বা গোসলের ব্যবস্থাও নেই।

পরিস্থিতি সামাল দিতে তুরস্কের সীমান্ত কর্তৃপক্ষও সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তুরস্কের আন্তর্জাতিক পরিবহন খাতের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে অতিরিক্ত লেন তৈরি এবং এক্স-রে স্ক্যানারের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে যানজট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় ৩০ দিন থেকে প্রায় ২২ দিনে নামিয়ে আনার কথাও জানানো হয়েছে।

গুরবুলাক সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত লেন তৈরির কাজও দেখা গেছে। তবে বাণিজ্যের চাপ যে হারে বাড়ছে, তাতে অবকাঠামো সম্প্রসারণের গতি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।

শুধু তুরস্ক নয়, পাকিস্তানের সঙ্গেও ইরানের স্থলবাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়ছে।

ইরানের পূর্ব সীমান্ত দিয়ে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও চালকেরা দীর্ঘ অপেক্ষার কথা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার মোমেনি বলেছেন, দুই দেশ সীমান্ত ক্রসিংগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে কুহাক এলাকায় নতুন একটি সীমান্ত ক্রসিং চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

এর ফলে তেহরান একই সঙ্গে তুরস্ক, পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্থলবাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

সমুদ্রপথের বাধা শুধু পরিবহন খাতেই প্রভাব ফেলছে না, এর প্রভাব পড়ছে ইরানের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

ইরানের পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০ মার্চ শুরু হওয়া ইরানি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির অর্থনীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছে। একই সময়ে তেলবহির্ভূত অর্থনীতিও সংকুচিত হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির মুদ্রা রিয়ালের ওপর চাপ এবং মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে স্থলসীমান্তে আটকে থাকা পণ্যগুলোর মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য রয়েছে। দীর্ঘ সময় ট্রাকে পড়ে থাকায় কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে পৃথক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ইরানের বর্তমান কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো সমুদ্রপথে তৈরি হওয়া বাণিজ্যিক সংকটের একটি বিকল্প তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, স্থলপথ দিয়ে সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন।

সমুদ্রপথে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা যায়। বিপরীতে স্থলসীমান্তে ট্রাক, কাস্টমস, সড়ক, গুদাম ও সীমান্ত অবকাঠামোর সক্ষমতা সীমিত। ফলে সমুদ্রপথের একটি অংশ স্থলপথে সরিয়ে নিলেই সীমান্তে দ্রুত চাপ তৈরি হচ্ছে।

ইরানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু নতুন বাণিজ্যপথ খুঁজে বের করা নয়; সেই পথ দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য দ্রুত পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি করা।

বর্তমানে তেহরান একদিকে স্থলসীমান্তের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বাণিজ্য ও নৌ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার পথও খোলা রাখছে।

ফলে তুরস্ক সীমান্তের দীর্ঘ ট্রাকের সারি এখন শুধু একটি সীমান্ত-জটের চিত্র নয়; এটি ইরানের সমুদ্রনির্ভর বাণিজ্যব্যবস্থায় তৈরি হওয়া বড় ধরনের পরিবর্তনেরও প্রতীক।