যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ দেখানোকে ‘দুর্বলতা’ বললো ইরানি পত্রিকা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের আগ্রহ প্রকাশকে ‘দুর্বলতার সংকেত’ হিসেবে দেখছে দেশটির কট্টরপন্থী দৈনিক কায়হান। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক নিউইয়র্ক সফরের সময় ইরানি কূটনীতিকদের আলোচনার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠার সমালোচনা করেছে পত্রিকাটি।

কায়হান বলেছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পেজেশকিয়ানের সফরের সময় ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা ওয়াশিংটনের কাছে ভুল বার্তা দিয়েছে। পত্রিকাটির মতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে আলোচনায় আগ্রহ দেখানো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইরানের অবস্থানকে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত কায়হানের এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউইয়র্কে ইরানের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল ‘তাড়াহুড়ো করা আচরণ ও অবস্থান’। আলোচনায় আগ্রহ দেখানোকে তারা ওয়াশিংটনের কাছে দুর্বলতার বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

হরমুজ ও ক্ষেপণাস্ত্রকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে কায়হান

কায়হানের মন্তব্যে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিতে ইরানের হাতে হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি পরিবহনপথ এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে। পত্রিকাটি দাবি করেছে, ওয়াশিংটন এসব চাপের মাধ্যম ছাড়া ইরানের সঙ্গে আলোচনায় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেবে না।

পত্রিকাটির এই অবস্থান ইরানের সাম্প্রতিক হরমুজ প্রস্তাব নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও সামনে এনেছে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো ও অবরোধ প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান বলেছে—যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার করলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ খুলে দেওয়া সম্ভব।

তবে কায়হান এই ধরনের আলোচনার উদ্যোগকে ভিন্নভাবে দেখছে। সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে পত্রিকাটি ইরানের সাত দিনের হরমুজ পরিকল্পনাকেও ‘দুর্বলতার সংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনাকে একটি ‘প্রতারণামূলক কৌশল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

পেজেশকিয়ানের কূটনৈতিক উদ্যোগ বনাম কট্টরপন্থীদের অবস্থান

নিউইয়র্ক সফরের সময় পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি কাঠামোর মধ্যে আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের কথাও উল্লেখ করেছেন।

আরাগচিও বলেছেন, ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকলেও কূটনীতির দরজা বন্ধ করছে না। তেহরানের সাত দিনের প্রস্তাবে হরমুজ পুনরায় চালু করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ কমানোর বিষয়গুলো আলোচনার শর্ত হিসেবে রয়েছে।

অন্যদিকে, কায়হানের মতো কট্টরপন্থী মহল মনে করছে, আলোচনায় অতিরিক্ত আগ্রহ দেখালে ইরানের ওপর আরও চাপ তৈরির সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা, নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজকে ঘিরে কী ধরনের কৌশল নেওয়া উচিত—এ নিয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার কথা বলেছেন, যদিও তিনি তেহরানের প্রস্তাবের শর্তগুলো গ্রহণ করেননি। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

ফলে ইরানের অভ্যন্তরে এখন মূল বিতর্ক শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হবে কি না, তা নিয়ে নয়; বরং আলোচনার সময়ে হরমুজ, অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক সক্ষমতাকে কীভাবে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।