নিরাপত্তার প্রশ্নে সৌদির পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতের মধ্যে রিয়াদের নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে ওয়াশিংটন সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।

সম্প্রতি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ওয়াশিংটনে রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি ইয়েমেনের পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়।

রুবিওর এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের উত্তেজনা বাড়ছে। এর আগে সৌদি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার আবেদন করলেও ওয়াশিংটন সরাসরি হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে মার্কিন পক্ষ থেকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার বিষয়ে সমঝোতার কথা উঠে এসেছে।

প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির অর্থ কী?

রুবিওর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে কৌশলগত অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে দেখছে—এমন বার্তা স্পষ্ট। তবে ‘প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি পূরণ’ বলতে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।

সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির নিরাপত্তা এখন শুধু স্থলসীমা বা আকাশ প্রতিরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তাও রিয়াদের অর্থনীতি ও জ্বালানি রপ্তানির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি সৌদির কাছে সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি একটি কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বার্তাও বহন করছে।

রুবিও ও ফয়সাল বিন ফারহানের বৈঠকে হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দুই পক্ষই আন্তর্জাতিক জলপথে নৌ চলাচল ও অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

এই দুটি জলপথ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান সমুদ্রপথগুলোর একটি। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যেকোনো একটি জলপথে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে জাহাজ চলাচলের সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। সে কারণে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের আলোচনায় এই দুই জলপথ একই সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সৌদি আরব একাধিক দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করছে। ২৫ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা রিয়াদে বৈঠক করে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সামরিক সমন্বয় এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

অর্থাৎ রিয়াদের নিরাপত্তা কাঠামো এখন একক কোনো অংশীদারের ওপর নির্ভর না করে একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ের দিকে এগোচ্ছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করায় সৌদি নিরাপত্তা কৌশলে ওয়াশিংটনের ভূমিকা আবারও সামনে এসেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে। সৌদি আরব সরাসরি হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক হামলা চাইলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে যাওয়ার বদলে গোয়েন্দা ও অন্যান্য সহায়তার দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

২৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে শুধু সামরিক নিরাপত্তা নয়, আঞ্চলিক সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। দুই পক্ষ আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সমর্থন এবং নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদারে সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে।

এটি দেখাচ্ছে, ওয়াশিংটন ও রিয়াদের বর্তমান সম্পর্ককে শুধু সামরিক সহযোগিতার কাঠামোয় দেখা হচ্ছে না। ইয়েমেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা—সবগুলো বিষয় এখন একই কৌশলগত আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার সঙ্গেও যুক্ত। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা প্রশ্নটি বৃহত্তর উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা হলো—সৌদি আরবের নিরাপত্তার বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বহাল রয়েছে। তবে সেই প্রতিশ্রুতি প্রয়োগের ধরন নির্ভর করবে পরিস্থিতির প্রকৃতি এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের ওপর।

অন্যদিকে সৌদি আরব একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখছে এবং পাকিস্তান-তুরস্কের মতো অংশীদারদের সঙ্গে সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা সমীকরণে তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে—সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইয়েমেনের হুথি সংঘাত এবং হরমুজ-বাব আল-মান্দাবের সমুদ্রপথ। এই তিন ক্ষেত্রের যেকোনো একটিতে উত্তেজনা বাড়লে অন্য দুই ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণেই রুবিওর ‘প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি পূরণের’ বক্তব্যকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ঘোষণা হিসেবে নয়, উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে।