কানাডার মানবাধিকার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশটির কনজারভেটিভ পার্টির ডেপুটি নেতা মেলিসা ল্যান্টসম্যান অভিযোগ করেছেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্য বা এজেন্টদের কানাডায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, মানবাধিকার ইস্যুতে কানাডা ‘খুব বাছাই করে’ অবস্থান নেয় এবং ইরানি-কানাডীয়দের প্রতি সরকারের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করা হয়নি।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) টরন্টো এলাকার ভনের একটি অনুষ্ঠানে ইরান ইন্টারন্যাশনালের সাংবাদিক মাহসা মোরতেজাভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ল্যান্টসম্যান এসব মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ইরানি-কানাডীয়দের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় অটোয়া যে দায়িত্ব বহন করে, তা যথাযথভাবে পালন করছে না। একই সঙ্গে কানাডার অভিবাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবেশ ঠেকানোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ল্যান্টসম্যানের অভিযোগের প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। কানাডা ২০২৪ সালের জুনে আইআরজিসিকে দেশটির Criminal Code-এর অধীনে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এরপর সংগঠনটির সদস্যদের কানাডায় প্রবেশ বা অবস্থানের ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার আইনি ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।
কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি কিংবা তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের কানাডায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি আগের নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই কানাডায় অবস্থান করছিলেন। তাদের বিষয়ে তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে অপসারণের প্রক্রিয়া চলছে।
অর্থাৎ ল্যান্টসম্যানের বক্তব্যের সঙ্গে কানাডা সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। অটোয়া বলছে, বর্তমান আইনে আইআরজিসি কর্মকর্তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ; তবে অতীতে প্রবেশ করা বা সংশ্লিষ্টতার তথ্য গোপন করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা একটি চলমান নিরাপত্তা ও অভিবাসন প্রক্রিয়া।
ইরানের আইআরজিসি দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কানাডা সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সময় এর কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কানাডার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কানাডার সীমান্ত ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ৫৭ জনকে আইআরজিসি সদস্য হওয়ার ভিত্তিতে অযোগ্য হিসেবে শনাক্ত করেছে। এসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কানাডার Immigration and Refugee Board-এর শুনানি প্রযোজ্য হতে পারে।
এ ছাড়া ইরানি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়েও কানাডায় আলাদা তদন্ত চলছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এমন ১৮২টি তদন্তের মধ্যে ৫২টি তখনও চলমান ছিল।
তবে ‘আইআরজিসি এজেন্ট’ বলতে ঠিক কতজন সক্রিয়ভাবে কানাডায় প্রবেশ করেছে বা অবস্থান করছে—এমন কোনো সরকারি সংখ্যা ল্যান্টসম্যানের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তাঁর অভিযোগকে কানাডায় আইআরজিসি এজেন্টদের উপস্থিতির নিশ্চিত পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কানাডায় আইআরজিসি-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্কের আরেকটি দিক হলো বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা। ইরানের অনেক নাগরিক বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্বের কারণে আইআরজিসিতে সেবা দিয়েছেন। কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা করলেই কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানাডায় অযোগ্য ঘোষণা করা হয় না; প্রত্যেকটি আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করা হয়।
এ কারণে কানাডার নীতিতে ‘আইআরজিসিতে কাজ করা’ এবং ‘আইআরজিসি-এর সদস্য হওয়া’—এই দুই বিষয়কে একইভাবে দেখা হয় না। আবেদনকারীর দায়িত্ব, ভূমিকা, সময়কাল এবং সংশ্লিষ্টতার প্রকৃতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে অটোয়া।
আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কানাডায় প্রবেশ নিয়ে চলতি বছরেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহদি তাজকে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং পরে তাঁকে কেন প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়—এ নিয়ে দেশটিতে প্রশ্ন ওঠে। কানাডা সরকার পরে জানায়, আইআরজিসি-এর বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তাদের কানাডায় প্রবেশের অনুমতি নেই।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরেই কানাডা ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা ও সরকারি কর্মকর্তা এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তালিকায় আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি সাইবার সংগঠনও রয়েছে।
ল্যান্টসম্যানের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কানাডার মানবাধিকার নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা। তাঁর অভিযোগ, একদিকে অটোয়া ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতির সমালোচনা করছে, অন্যদিকে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কানাডায় প্রবেশ বা অবস্থান ঠেকাতে যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না।
অন্যদিকে কানাডা সরকার বলছে, আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পর এর সদস্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত ও অপসারণে তদন্ত চলছে।
ফলে বিতর্কটি এখন শুধু ইরানি নাগরিকদের অভিবাসন বা প্রবেশাধিকার নিয়ে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি হস্তক্ষেপ, ট্রান্সন্যাশনাল দমন-পীড়ন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ইরানি-কানাডীয়দের সুরক্ষা—চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কানাডা এরই মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে। কিন্তু ল্যান্টসম্যানের অভিযোগ দেখাচ্ছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন প্রশ্ন উঠছে—আইনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেই কি আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত ও ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে, নাকি বাস্তব প্রয়োগে আরও জটিলতা রয়েছে।