'ট্রাম্পের কারণে আজ মূল্য দিতে হচ্ছে মার্কিন জনগণ ও সেনাদের'

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ অষ্টম মাসে প্রবেশ করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার। তাঁর অভিযোগ, যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শেষ করার কথা বললেও সংঘাত এখন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। এতে মার্কিন সেনাসদস্য ও সাধারণ মানুষকে এর মূল্য দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শুমার লিখেছেন, “মনে আছে, ট্রাম্প বলেছিলেন ইরানে তাঁর যুদ্ধ মাত্র চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলবে?” এরপর তিনি বলেন, এখন যুদ্ধ অষ্টম মাসে পৌঁছেছে এবং এর মূল্য দিচ্ছেন মার্কিন জনগণ ও দেশটির সেনারা।

যুদ্ধের সময়কাল নিয়ে ট্রাম্পের প্রাথমিক বক্তব্যের বিষয়টি আগেও আলোচনায় এসেছে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে মার্কিন অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে। পরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়সীমা নিয়ে তাঁর বক্তব্য একাধিকবার পরিবর্তিত হয়।

শুমারের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন কংগ্রেসের ভূমিকাও। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে সিনেটের রিপাবলিকান সদস্যদের সামনে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, তারা সেই উদ্যোগের পরিবর্তে সংঘাত অব্যাহত রাখার পথেই ভোট দিয়েছেন।

২৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন সিনেটে ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি War Powers Resolution নিয়ে ভোট হয়। কংগ্রেসের সরকারি নথিতে প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ শুমারের বক্তব্য শুধু যুদ্ধের মেয়াদ নিয়ে নয়; নির্বাহী বিভাগের সামরিক ক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকা উচিত, সেই বিতর্কও এতে যুক্ত হয়েছে।

বাড়ছে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যয়

ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। জুলাইয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটের এক শুনানিতে জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত হিসাব করলে ইরান যুদ্ধের ব্যয় প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তিনি আরও সামরিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।

২৪ সেপ্টেম্বরের কংগ্রেসনাল রেকর্ডে সিনেটর ক্রিস কুনসসহ কয়েকজন আইনপ্রণেতা যুদ্ধের আর্থিক ও মানবিক ব্যয় তুলে ধরেন। ওই আলোচনায় অন্তত ১৯ মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। একই নথিতে কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, যুদ্ধের প্রথম চার মাসেই ব্যয় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।

তবে এসব পরিসংখ্যানের হিসাবের সময়কাল ও অন্তর্ভুক্ত ব্যয়ের ধরন ভিন্ন হতে পারে। ফলে বিভিন্ন সরকারি বক্তব্যে যুদ্ধের মোট ব্যয়ের পরিমাণে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

যুদ্ধ শেষ করার পথ কোথায়?

শুমারের সমালোচনার মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরান যুদ্ধের শেষ কোথায় এবং কীভাবে হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনে ক্রমবর্ধমান বিতর্ক।

আগস্টে অ্যাক্সিওসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের সামরিক অভিযানের কথা বললেও কয়েক মাস পর সংঘাতের সম্ভাব্য সমাপ্তির পথ বদলে যায়। সামরিক অভিযান থেকে আলোচনার উদ্যোগ এবং পরে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল—একাধিক পথ নিয়ে তাঁর প্রশাসন এগিয়েছে।

এদিকে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও ইরান যুদ্ধের অবসান ও নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। কংগ্রেসের একাংশ সামরিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইনসভা থেকে নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে চাপ অব্যাহত রাখার অবস্থানে রয়েছে।

ইরান যুদ্ধ এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতি বা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের ব্যয়, মার্কিন সেনাদের হতাহত এবং জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে অবশ্য যুদ্ধের মেয়াদ, সামরিক অর্থায়ন এবং প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও দলটির বড় অংশ এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানকে সমর্থন করছে।

২৪ সেপ্টেম্বরের সিনেট বিতর্কে যুদ্ধের প্রায় সাত মাসের ব্যয়, সেনাদের হতাহত এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়। ফলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও মার্কিন অর্থনীতি, সামরিক প্রস্তুতি এবং কংগ্রেস-হোয়াইট হাউসের ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

শুমারের বক্তব্য সেই বৃহত্তর বিতর্কেরই অংশ। তাঁর প্রশ্ন হলো—যে সামরিক অভিযানকে শুরুতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছিল, সেটি যদি মাসের পর মাস চলতে থাকে, তাহলে এর লক্ষ্য, ব্যয় এবং সমাপ্তির কৌশল নিয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখাই দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার একটি উপায়। ফলে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সামরিক চাপ অব্যাহত থাকবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পরিবর্তে নতুন কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হবে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন