সিলিকন ভ্যালি উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি অঞ্চল, যা বিশ্বব্যাপী উচ্চ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এই সিলিকন ভ্যালিতে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে নারীদের মধ্যে গোপনে তথ্য আদান-প্রদানের একটি কথিত নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে। এই নেটওয়ার্কে প্রযুক্তি খাতের শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘হুইসপার নেটওয়ার্ক’ নামে পরিচিত এই অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীরা একে অন্যকে কথিত যৌন অসদাচরণ সম্পর্কে সতর্ক করেন। নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি স্প্রেডশিটে শতাধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে।
স্প্রেডশিটে থাকা অভিযোগগুলোর ধরন এক নয়। এর মধ্যে কাউকে মাদক প্রয়োগ, যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতের রায় বা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
সিলিকন ভ্যালির ২০-এর কোঠায় থাকা এক প্রযুক্তিকর্মী জানান, প্রথমবার তালিকাটি দেখে তিনি বিস্মিত হন। পরে নেটওয়ার্কের সঙ্গে পরিচিত কয়েকজন নারীর সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি নিজেও কথিত যৌন অসদাচরণের একটি ঘটনা সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা জানান।
ওই নারী বলেন, তালিকায় থাকা কিছু ব্যক্তি ছিলেন পরিচিত বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী। তাদের কয়েকজনকে তিনি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে আগে দেখেছেন বলেও জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক নারী পুলিশের কাছে যাওয়া বা প্রকাশ্যে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে দ্বিধায় থাকেন। কারণ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ওই নারী বলেন, নিজের ঘটনায় বিচার চাইতে গিয়ে যদি তিনি ব্যর্থ হন, তাহলে সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারীদের কাছে তার পেশাগত ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা তার ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলিকন ভ্যালির কিছু তথাকথিত ‘হ্যাকার হাউস’ ও উদ্যোক্তা কমিউনিটিতে ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থাকে। একই বাড়িতে বসবাসকারী ব্যক্তিরা পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক অংশীদার, বিনিয়োগকারী, সহকর্মী কিংবা সম্ভাব্য নিয়োগদাতা হয়ে উঠতে পারেন।
কয়েকজন সূত্রের দাবি, এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কখনো কখনো অভিযোগকারীদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও অভিযোগকারী একই সামাজিক বা ব্যবসায়িক পরিসরের অংশ হতে পারেন।
সান ফ্রান্সিসকোর একটি হ্যাকার হাউসের সাবেক সদস্য এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইয়েহং ঝু প্রকাশ্যে নিজের একটি অভিযোগের কথা জানিয়েছেন। তিনি ওই কমিউনিটির এক সাবেক সদস্যের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছিলেন।
ঝু ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। তার দাবি, অভিযোগের পর ওই ব্যক্তি পালিয়ে যান এবং তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। একই সামাজিক পরিসরের কিছু মানুষ বিষয়টি নিয়ে জড়াতে অনিচ্ছা দেখিয়েছিলেন বলেও তিনি জানান।
ঝুর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পুলিশ ও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ওই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে তার পরিচিতদের কাছেও সহায়তা চান। তবে তাদের কেউ কেউ ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে বিষয়টিতে জড়াতে চাননি।
তবে সব ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেভারলি হিলসের উদ্যোক্তা কমিউনিটি ‘লঞ্চ হাউস’-এর এক সাবেক বাসিন্দা জানান, একটি অনুষ্ঠানে তিনি সন্দেহ করেছিলেন যে তাকে মাদক প্রয়োগ করা হয়েছিল। ওই নারী বলেন, রাতের কিছু অংশ তার মনে নেই এবং পরে জানতে পারেন, এক বন্ধু তাকে বিছানায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
তার দাবি, পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন নারী তাকে জানান, একই ব্যক্তি তাদের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছিলেন বা যৌন হয়রানিমূলক আচরণ করেছিলেন।
অভিযোগগুলো নিয়ে নারীরা একসঙ্গে লঞ্চ হাউসের প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দ্রুত ওই কমিউনিটি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও দেওয়া হয়েছিল।
তবে ওই নারী শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে অভিযোগ করেননি। কারণ, ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ তার মনে না থাকায় অভিযোগটি প্রমাণ করা কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেছিলেন।
লঞ্চ হাউসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্রেট গোল্ডস্টেইন দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে জানান, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আগের কাঠামোয় পরিচালিত হয় না। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও আচরণবিধি তৈরির ক্ষেত্রে মানবসম্পদ এবং নিরাপত্তা বিষয়ে বাইরের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা জগতের ঘনিষ্ঠ সামাজিক কমিউনিটিতে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ নতুন নয়। একই সামাজিক পরিসরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ব্যবসা ও পেশাগত যোগাযোগ একসঙ্গে চলার কারণে অভিযোগকারীদের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে—এমন উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।
২০২২ সালে এআই গবেষক কীর্তনা গোপালকৃষ্ণন ‘ইফেক্টিভ অ্যালট্রুইজম’ কমিউনিটিতে যৌন চাপের বিষয়ে লিখেছিলেন। তিনি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে কমিউনিটি-ভিত্তিক মধ্যস্থতার ব্যবহার এবং সম্মতিপূর্ণ যৌন সম্পর্ক ও জবরদস্তির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সিলিকন ভ্যালির কথিত ‘হুইসপার নেটওয়ার্ক’ নিয়ে প্রকাশিত তথ্য মূলত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এসেছে। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো পৃথকভাবে যাচাই করা হয়নি—ফলে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।