৫৪৮ জনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করলেন ক্যালিফোর্নিয়ায় গভর্নর

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ জনের সাজা কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউসম। তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে প্যারোলের সুযোগ ছাড়াই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একসঙ্গে এত মানুষের সাজা কমানোর ঘটনা এটিই সবচেয়ে বড়।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এ ঘোষণা দেন গভর্নর। এর মধ্য দিয়ে কার্যত অঙ্গরাজ্যটির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের তালিকা খালি হয়ে যাবে। যদিও গত ২০ বছরে ক্যালিফোর্নিয়ায় কোনো বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।

এক খোলা চিঠিতে নিউসম বলেন, রাষ্ট্রের অনুমোদনে কাউকে হত্যা করা ক্যালিফোর্নিয়ার মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি বিচারব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং সমাজের প্রত্যেক মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। এ বিশ্বাস থেকেই তিনি সাজা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের প্রতি জনসমর্থন ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে কমেছে। তবে এখনো দেশটির অধিকাংশ মানুষ এ শাস্তির পক্ষে। গত আগস্টে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। তবে প্রায় ৭৩ শতাংশ মনে করেন, এ শাস্তি কার্যকর করতে গিয়ে নির্দোষ কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের মামলায় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও আপিলের সুযোগ থাকায় অনেক বন্দির ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত সাজা কার্যকর হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ২৩টি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডের বিধান পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও কার্যত তা প্রয়োগ করা হয় না।

তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গুরুতর ফেডারেল অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গত এপ্রিলে তাঁর প্রশাসন ফেডারেল পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিধি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টিও ছিল।

মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকেরা দাবি করেন, এ শাস্তি অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে সমালোচকদের মতে, কয়েক দশকের গবেষণায় অপরাধ প্রতিরোধে মৃত্যুদণ্ডের কার্যকারিতার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া নৈতিকতা, বাস্তবায়নের জটিলতা এবং বিপুল ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের (ডিপিআইসি) হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৮ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়া মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত কার্যক্রমে ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। অথচ এ সময়ে মাত্র ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

জাতিগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের অসম প্রয়োগ এবং সাজা কার্যকরের সময় নানা জটিলতার ঘটনাও এ শাস্তির সমালোচনার কারণ। ডিপিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্তত ২০৩ জন পরে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেয়েছেন।

নিউসমের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন অপরাধবিচার সংস্কার সংগঠন। তাদের মতে, মৃত্যুদণ্ড একটি পুরোনো, অকার্যকর ও অনৈতিক শাস্তিব্যবস্থা। ডিপিআইসির নির্বাহী পরিচালক রবিন মাহের এক বিবৃতিতে বলেন, নিউসমের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। অতীতেও অন্য গভর্নররা ব্যাপকভাবে সাজা মওকুফ করেছেন, তবে এত বড় পরিসরে এমন ঘটনা ঘটেনি।

মাহের আরও বলেন, গভর্নর হিসেবে দায়িত্বের শুরুতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ এবং এখন গণহারে সাজা কমানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নিউসম ক্যালিফোর্নিয়ার মৃত্যুদণ্ডনীতি অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে দিয়েছেন।

তবে সাজা কমানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মামলার পর্যালোচনা করতে হবে ক্যালিফোর্নিয়ার সুপ্রিম কোর্টকে। অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, একাধিক গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সাজা মওকুফের ক্ষেত্রে আদালতের পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক।

রাজনৈতিকভাবে উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত হলেও গত শতকের শেষ দিকে কঠোর অপরাধ দমননীতির পরীক্ষাগার ছিল ক্যালিফোর্নিয়া। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ওয়াশিংটন ও ক্যালিফোর্নিয়া প্রথম দিকের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ছিল, যারা ‘থ্রি স্ট্রাইকস’ আইন চালু করে। এ আইনে বারবার অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ন্যূনতম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়।

এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়াতেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। নিউসমের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশজুড়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় সাফল্যের কয়েক দিন পর নিউসমের এ ঘোষণা এল। নির্বাচনে টেক্সাস ও কানসাসের মতো একসময় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য জয় পেয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এ সাফল্যকে ‘ব্লু ওয়েভ’ বলা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে কয়েকজনের নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রায় আট বছর ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নরের দায়িত্ব পালন করছেন নিউসম। অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, তিনি মেয়াদসীমায় পৌঁছে গেছেন। তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হবে। আগামী ৪ জানুয়ারি সাবেক মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেভিয়ার বেসেরা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন।

তবে দীর্ঘদিন ধরেই নিউসমকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার ও সমর্থন জানাতেও তিনি সাম্প্রতিক সময়ে বেশি সময় দিচ্ছেন।

অবশ্য অপরাধবিচারসংক্রান্ত কিছু বিষয়ে নিউসমের অবস্থানের সঙ্গে সংস্কারপন্থী সংগঠন ও অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের মতবিরোধ রয়েছে। ২০২২ সালে কারাগারে নির্জন কারাবাসের ব্যবহার সীমিত করার একটি বিলে ভেটো দিয়েছিলেন তিনি। নির্দিষ্ট সময়ের বেশি নির্জন কারাবাসকে জাতিসংঘ নির্যাতন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

এ ছাড়া ২০১৯ সালে কারাগার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই) সহযোগিতা সীমিত করার একটি বিলেও ভেটো দেন নিউসম। একই ধরনের আরেকটি বিল ২০২২ সালে অঙ্গরাজ্যের সিনেটে পাস হতে ব্যর্থ হয়।

সূত্র: আল-জাজিরা

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত