ফ্লাইদুবাইয়ের সেই সহ-পাইলট কে, কেন তাকে নিয়ে এত প্রশ্ন?

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে মাঝ আকাশে ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত এবং বিমানটি বিধ্বস্তের চেষ্টার অভিযোগে আটক সহ-পাইলটকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তিনি কে, তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কীভাবে তিনি ইসরায়েলগামী একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটের ককপিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এখন পর্যন্ত তাঁর নাম প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে তিন ইসরায়েলি কর্মকর্তার একজনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন হামলাকারী ওমানের নাগরিক। সৌদি আরবে বিমানটি জরুরি অবতরণের পর তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর জাতীয়তার তথ্যও আল জাজিরা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটে। বিমানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের দিকে যাচ্ছিল। উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সহিংস ঘটনা শুরু হয় বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সহ-পাইলট ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর বিমানটির উচ্চতা দ্রুত কমতে শুরু করে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতা হারায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় বিমান থেকে জরুরি সংকেত পাঠানো হয়।

এরপর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে ঢুকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করেন বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর বিমানটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা হয়। শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে। বিমানে থাকা ১৭৪ যাত্রী নিরাপদে ছিলেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো তাঁর উদ্দেশ্য। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, সহ-পাইলট ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করার পর বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে মনে হচ্ছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা হিসেবে তদন্ত করছে।

তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। আল জাজিরা জানিয়েছে, বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফ্লাইদুবাইও ঘটনাটিকে ককপিটের একটি ‘ইনসিডেন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে না যাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা জানিয়েছে।

ওমানের নাগরিক কীভাবে ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে?

এই প্রশ্নটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ওমান ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ফ্লাইদুবাই একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিককে পাইলট হিসেবে নিয়োগ দেয়।

তাই একজন ওমানি নাগরিকের ফ্লাইদুবাইয়ে কাজ করা নিজেই অস্বাভাবিক নয়। বরং তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—ইসরায়েলগামী নির্দিষ্ট এই ফ্লাইটে তাঁর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সহ-পাইলট ফ্লাইদুবাইয়ে এক বছরেরও কম সময় আগে যোগ দিয়েছিলেন। তবে তাঁর নাম, পূর্ববর্তী কর্মজীবন বা ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে এখনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ক্যাপ্টেনের পরিচয় জানা গেলেও সহ-পাইলটের নয়

অন্যদিকে, হামলায় আহত ক্যাপ্টেনের পরিচয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ভারতীয় নাগরিক স্মিত মাচ্ছর, যিনি ফ্লাইদুবাইয়ের বোয়িং ৭৩৭ বহরে ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু তাঁর বিপরীতে সহ-পাইলটের নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো নাম, ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্যকে যাচাই ছাড়া ব্যবহার করলে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তদন্তে সামনে আসতে পারে আরও তথ্য

ঘটনার তদন্তে এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে, সহ-পাইলট কীভাবে ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ করার সুযোগ পেলেন, ককপিটে যাত্রী বা অন্য ক্রু কীভাবে প্রবেশ করলেন এবং বিমানটির আকস্মিক উচ্চতা পতনের প্রকৃত কারণ কী।

এ ছাড়া তাঁর পেশাগত ইতিহাস, নিয়োগ ও নিরাপত্তা যাচাই, সম্ভাব্য উদ্দেশ্য এবং অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সন্দেহভাজন সহ-পাইলটকে ওমানের নাগরিক হিসেবে একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা শনাক্ত করেছেন এবং তাঁকে সৌদি আরবে আটক করা হয়েছে; কিন্তু তাঁর নাম প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি। একই সঙ্গে তাঁর উদ্দেশ্য বা ঘটনাটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্ত শেষ হয়নি।