ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রার্থী ‘ট্রাম্প’, ‘ওবামা’!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাজ, চুলের ধরন, কমলা রঙের লম্বা টাই, করমর্দন ও হাঁটার ভঙ্গি—সবকিছুতেই যেন ট্রাম্পের ছাপ। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নন; ব্রাজিলের আসন্ন নির্বাচনে কংগ্রেসের সদস্য হতে লড়ছেন ৫৯ বছর বয়সী হেলিকপ্টার পাইলট প্লিনিও ভিসেন্তিন জুনিয়র। নির্বাচনী প্রচারে তার নাম ‘প্লিনিও ট্রাম্প’।

মিনাস জেরাইস রাজ্যের রাস্তায় পুরোনো পন্টিয়াক গ্র্যান্ড ভিল গাড়ি নিয়ে প্রচারে বের হন প্লিনিও। গাড়ির সামনে উড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। নিজেকে ট্রাম্পের আদলে উপস্থাপন করে এরই মধ্যে স্থানীয় মানুষের দৃষ্টি কেড়েছেন তিনি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে প্লিনিও বলেন, ট্রাম্প ‘জনপ্রিয় ও আইকনিক’ হওয়ায় তাকে নিয়ে খুব কম মানুষই ঠাট্টা করেছে; বরং বেশির ভাগ মানুষ হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানিয়েছে এবং জড়িয়ে ধরেছে।

২০২৬ সালের ব্রাজিলের নির্বাচনে প্লিনিও প্রথমবারের মতো ফেডারেল ডেপুটি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দেশটির নির্বাচনী নিবন্ধন অনুযায়ী তার পূর্ণ নাম প্লিনিও ভিসেন্তিন জুনিয়র এবং নির্বাচনী নাম ‘প্লিনিও ট্রাম্প’। তিনি নভো (NOVO) দলের প্রার্থী হিসেবে মিনাস জেরাইস থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ব্রাজিলের নির্বাচনে পরিচিত ব্যক্তি বা জনপ্রিয় সংস্কৃতির চরিত্রের নামে প্রার্থী হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এবারের নির্বাচনেও এমন বেশ কয়েকজন প্রার্থী রয়েছেন।

রিও ডি জেনিরোর ৫৭ বছর বয়সী ক্লদিও হেনরিক দস আনজস নির্বাচনী পরিচিতিতে ‘হেনরিক বারাক ওবামা’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে গোইয়াস রাজ্যের আইনসভায় প্রার্থী ৬৬ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি ওয়ালসি কালিক্সতো ভিয়েরা ব্যবহার করছেন ‘মিক জ্যাগার’ নাম। অবশ্য তিনি ব্রিটিশ রক ব্যান্ড দ্য রোলিং স্টোনসের গায়ক মিক জ্যাগার নন।

এ ছাড়া নির্বাচনে ‘সামুরাই ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘সুনামি গ্র্যান্ডমাদার’, ‘হু হু’ ও ‘লোনলি বয়’-এর মতো অদ্ভুত বা রসাত্মক নামেও প্রার্থী হয়েছেন অনেকে। এবারের কংগ্রেস নির্বাচনে ৭ হাজার ৮০০-এর বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন; তাদের মধ্যে কয়েকশ প্রার্থী নিজেদের পরিচিতি বা প্রচারে এমন ব্যতিক্রমী নাম ব্যবহার করছেন।

এ ধরনের প্রার্থীদের উপস্থিতি ব্রাজিলের রাজনীতিতে বহু পুরোনো। ১৯৫৯ সালে সাও পাওলোর একটি সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে প্রায় এক লাখ ভোটার ব্যালটে শহরের চিড়িয়াখানার একটি গণ্ডারের নাম ‘ক্যাকারেকো’ লিখেছিলেন। ঘটনাটি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদী ভোট হিসেবে পরিচিতি পায়।

পরবর্তী সময়ে ড. এনিয়াস কারনেইরো এবং কৌতুকশিল্পী তিরিরিকার মতো প্রার্থীরাও ব্রাজিলের রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী পরিচিতি তৈরি করেন। বিশেষ করে তিরিরিকা ২০১০ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন।

তবে এসব নাম শুধু হাস্যরসের বিষয় নয়; এর একটি নির্বাচনী প্রভাবও রয়েছে। ব্রাজিলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় কোনো প্রার্থী যে ভোট পান, তা তার দলের মোট ভোটের হিসাবেও যুক্ত হয়। ফলে কোনো ব্যতিক্রমী প্রার্থী নিজে নির্বাচিত না হলেও তার পাওয়া ভোট দলের সামগ্রিক আসনসংখ্যায় প্রভাব ফেলতে পারে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কার্লোস মেলোর মতে, প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি আস্থার সংকটের সঙ্গে এ ধরনের প্রার্থীদের উত্থানের সম্পর্ক রয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যা একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ; সব ব্যতিক্রমী প্রার্থী একই উদ্দেশ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন—এমনটা বলা যায় না।

এবারের নির্বাচনে তাই ‘প্লিনিও ট্রাম্প’, ‘বারাক ওবামা’ কিংবা ‘মিক জ্যাগার’-এর মতো নাম শুধু প্রচারের কৌতুকের বিষয় নয়। ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের প্রতিবাদী ও ব্যতিক্রমী নির্বাচনী সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় এসব প্রার্থী কীভাবে ভোটারদের আকর্ষণ করেন, সেটিও নির্বাচনী রাজনীতির একটি আলোচিত দিক।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট