‘ভোট কারচুপি’ তত্ত্ব যুক্তরাষ্ট্রে কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ, অনিয়মের অভিযোগ কিংবা ভোট জালিয়াতির ঘটনা নতুন নয়। নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন প্রতারণা বা ত্রুটির ঘটনা ইতিহাসে ঘটেছে এবং সেগুলো তদন্ত ও বিচারের আওতায়ও এসেছে। কিন্তু গত এক দশকে ‘ভোট কারচুপি’ বা ‘নির্বাচন চুরি’ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার বৈশিষ্ট্য ভিন্ন, একটি রাজনৈতিক দাবি ধীরে ধীরে দলীয় বিতর্ক, গণমাধ্যম, আদালত এবং শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। ২০২৬ সালে এসে সেই পুরোনো দাবির কিছু অংশ আবার মার্কিন সরকারি ব্যবস্থার ভেতরে তদন্তের বিষয় হয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে ভোটযন্ত্রে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রমাণ খোঁজার একটি উদ্যোগ পুয়ের্তো রিকো থেকে শুরু হয়ে ফেডারেল তদন্ত ব্যুরো, বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দপ্তর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তবে ওই অনুসন্ধানে ভোট কারচুপির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে ভোট জালিয়াতির অভিযোগের ইতিহাস বহু পুরোনো। গবেষকরা দেখিয়েছেন, উনিশ ও বিশ শতকের বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী প্রতারণার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভোটার নিবন্ধন, পরিচয় যাচাই এবং ভোটদানের নিয়ম কঠোর করার দাবি উঠেছে।

২০১৬ সালে ‘রাজনৈতিক বিজ্ঞান ত্রৈমাসিক’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, ‘ভোটার জালিয়াতি’র আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে আইন পরিবর্তনের প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত প্রগতিশীল যুগ পর্যন্ত ফিরে যায়। গবেষণাটির লেখক দেখিয়েছেন, ভোটার প্রতারণার আশঙ্কা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বিভিন্ন সময়ে ভোটার নিবন্ধন সহজ বা কঠিন করার নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একই গবেষণায় বিদ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ভোটার জালিয়াতির ঘটনা বিরল।

অর্থাৎ ‘ভোট কারচুপি’ ধারণাটি ট্রাম্পের আবিষ্কার নয়। তাঁর সময়ের পরিবর্তন হলো—এই পুরোনো ধারণাটি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়।

২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন।

তিনি দাবি করেছিলেন, মৃত ব্যক্তিদের নামে ভোট পড়ছে, অনিবন্ধিত বা অযোগ্য অভিবাসীরা ভোট দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিতভাবে ভোট কারচুপি হচ্ছে।

ফ্যাক্টচেক ডট অর্গ তখন এসব দাবির উৎস পরীক্ষা করে দেখতে পায়, যে তথ্যগুলো ট্রাম্প ব্যবহার করছিলেন সেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে প্রকৃত ভোট জালিয়াতির প্রমাণের সম্পর্ক ছিল না। উদাহরণ হিসেবে, ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম থাকা এবং সেই মৃত ব্যক্তিদের বাস্তবে ভোট দেওয়া দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

২০১৮ সালে ‘নির্বাচনী অধ্যয়ন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও ২০১৬ সালের নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের ব্যাপক ভোট জালিয়াতির দাবিগুলো পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা বলেন, তাঁরা এমন কোনো প্রমাণ পাননি যা ২০১৬ সালের নির্বাচনে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত ভোট জালিয়াতির দাবিকে সমর্থন করে।

কারণ, নির্বাচনের ফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি করার জন্য সব সময় আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন হয় না; দীর্ঘ সময় ধরে একই অভিযোগ রাজনৈতিক বক্তৃতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পুনরাবৃত্তি হলেও জনমনে তার প্রভাব তৈরি হতে পারে।

২০২০ সালের নির্বাচন এই বিতর্ককে সম্পূর্ণ নতুন পর্যায়ে নিয়ে যায়।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ডাকযোগে ভোট ও আগাম ভোটের ব্যবহার বাড়ে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময়ও রাজ্যভেদে পার্থক্য ছিল। ট্রাম্প নির্বাচনের আগেই ডাকযোগে ভোট নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

নির্বাচনের পর সেই সন্দেহ আরও বিস্তৃত হয়। ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীরা দাবি করতে থাকেন যে ভোটযন্ত্র, ডাকযোগে ব্যালট, মৃত ব্যক্তির ভোট, বিদেশি হস্তক্ষেপসহ নানা উপায়ে নির্বাচনের ফল পরিবর্তন করা হয়েছে।

কিন্তু নির্বাচনী নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা তখন ভিন্ন চিত্র দেন।

২০২০ সালের ১২ নভেম্বর সাইবার ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থা এবং নির্বাচন অবকাঠামো সরকারি সমন্বয় পরিষদসহ নির্বাচন অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলেন, ওই নির্বাচন ছিল ‘আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে নিরাপদ’ নির্বাচনগুলোর একটি এবং কোনো ভোটিং ব্যবস্থা ভোট মুছে দিয়েছে, হারিয়েছে বা পরিবর্তন করেছে—এমন প্রমাণ তাঁরা পাননি।

এরপর বিচার বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের যৌথ মূল্যায়নেও বলা হয়, কোনো বিদেশি সরকার ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল পরিবর্তন করেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কে হস্তক্ষেপের কিছু ঘটনা শনাক্ত হলেও ভোটের ফল পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাহলে সরকারি ব্যবস্থার ভেতরে বিতর্ক তৈরি হলো কীভাবে?

এখানেই ২০২০ সালের পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নির্বাচন কর্মকর্তারা, সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ও বিচার বিভাগের তদন্তে ব্যাপক কারচুপির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর রাজনৈতিক সহযোগীদের অভিযোগ অব্যাহত থাকে।

মার্কিন কংগ্রেসের ৬ জানুয়ারি হামলা তদন্তকারী কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সাবেক কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, বিচার বিভাগের তদন্তে ২০২০ সালের ফল পরিবর্তন করার মতো ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বারও প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছিলেন যে তাঁর কাছে ফল পরিবর্তন করার মতো ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ নেই। হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরাও একই অবস্থান নিয়েছিলেন।

পিউ গবেষণা কেন্দ্রের ২০২১ সালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে ট্রাম্পকে প্রধান সংবাদসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা রিপাবলিকানদের মধ্যে ভোট জালিয়াতি নিয়ে উদ্বেগ অন্য রিপাবলিকানদের তুলনায় বেশি ছিল।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের জরিপে ট্রাম্প ও তাঁর প্রচারাভিযানকে প্রধান সংবাদসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা রিপাবলিকানদের ৬১ শতাংশ বলেছিলেন, অতীতে ডাকযোগে ভোটে জালিয়াতি বড় সমস্যা ছিল। অন্য রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার ছিল ৩৬ শতাংশ। নির্বাচনের পরও দুই দলের মধ্যে ডাক ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায়।

এর অর্থ এই নয় যে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সব মানুষ একই বিশ্বাস ধারণ করেন। বরং জরিপটি দেখায়, তথ্যের উৎস ও রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে নির্বাচনী বিশ্বাসের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

২০২০ সালের পর ভোটযন্ত্রকে ঘিরে একটি বিশেষ তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়—কিছু যন্ত্র নাকি ট্রাম্পের ভোট বদলে বাইডেনের পক্ষে দিয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগের মধ্যে ডমিনিয়ন ভোটিং সিস্টেমসের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে।

কিন্তু গবেষণায় এসব দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০২১ সালে ‘বিজ্ঞানবিষয়ক জাতীয় একাডেমির কার্যবিবরণী’তে প্রকাশিত গবেষণায় ভোটযন্ত্র, ভোটের পরিসংখ্যান এবং অন্যান্য বহুল প্রচারিত দাবিগুলো পরীক্ষা করে গবেষকরা পদ্ধতিগত ভোট জালিয়াতির প্রমাণ পাননি।

এখানে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে। কোনো ভোটযন্ত্রে নিরাপত্তাগত দুর্বলতা থাকা সম্ভব—যেমন অন্য অনেক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাতেও থাকে। কিন্তু দুর্বলতা থাকা এবং সেই দুর্বলতা ব্যবহার করে বাস্তবে লাখ লাখ ভোট পরিবর্তন করা একই বিষয় নয়।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানেও এই পার্থক্যটি উঠে এসেছে। ২০২২ সালের সাইবার ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থার পর্যালোচনায় কিছু ডমিনিয়ন ব্যবস্থায় সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করে ভোট পরিবর্তন করা হয়েছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পুরোনো অভিযোগ নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে।

২০২৫ সালের জুনে পুয়ের্তো রিকোর নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি ডমিনিয়ন ভোটযন্ত্র পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এর লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপ বা ভোটযন্ত্রের কারসাজির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না তা অনুসন্ধান করা।

এই তদন্তের সঙ্গে পরে যুক্ত হয় ফেডারেল তদন্ত ব্যুরো, বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দপ্তর।

কিন্তু রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে পরীক্ষা চালানোর পরও যন্ত্রে বিদেশি হ্যাকিংয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ যে দাবি আগে মূলত রাজনৈতিক প্রচারণা ও গণমাধ্যমের বিতর্কে ছিল, সেটি এখন রাষ্ট্রীয় তদন্তের আওতায় এসেছে—কিন্তু তদন্তের ফলাফল এখন পর্যন্ত সেই দাবিকে প্রমাণ করেনি।

ভোটিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। সাইবার হামলা, ভুল ভোটার তালিকা, প্রশাসনিক ভুল, ব্যালট পরিবহন, যন্ত্রের ত্রুটি—এসবই নির্বাচন পরিচালনার বাস্তব ঝুঁকি।

এই কারণে নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে তদন্ত বা সংস্কারের প্রয়োজন অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু এখানেই বিতর্কের দ্বিতীয় স্তরটি তৈরি হয়েছে—নিরাপত্তার সম্ভাব্য দুর্বলতা এবং বাস্তবে নির্বাচন চুরি হওয়ার দাবির মধ্যে সীমারেখা কোথায়?

২০২৫ সালের মার্চে ট্রাম্প প্রশাসন ‘আমেরিকার নির্বাচনের অখণ্ডতা সংরক্ষণ ও সুরক্ষা’ শিরোনামে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে। এতে ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের নথি, ভোটার তালিকা যাচাই, ডাকযোগে ভোটের নিয়ম এবং ভোটিং ব্যবস্থায় কাগজের রেকর্ডসহ একাধিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সরকারের যুক্তি ছিল—নির্বাচনে অবৈধ ভোট, বিদেশি হস্তক্ষেপ, ভুল ভোটার তালিকা ও অন্যান্য অনিয়ম ঠেকাতে আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

২০২৫–২৬ সালে ভোট জালিয়াতির আলোচনায় আরেকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়—অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া।

ফেডারেল নির্বাচনে অ-মার্কিন নাগরিকের ভোট দেওয়া আগে থেকেই বেআইনি। তবে কতটা ব্যাপকভাবে এমন ঘটনা ঘটে—তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক একটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দেশজুড়ে কয়েক কোটি ভোটের তুলনায় অ-মার্কিন নাগরিকের বেআইনি ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত কম।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টিকে নির্বাচনী নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।

এই অবস্থান থেকেই ভোটার নাগরিকত্ব যাচাই, ভোটার তালিকা পর্যালোচনা এবং ফেডারেল সংস্থার তথ্য ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মার্চ ২০২৬-এর হোয়াইট হাউসের একটি ঘোষণায় নাগরিকত্ব যাচাই এবং ফেডারেল নির্বাচনে ভোটার যোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য নতুন ব্যবস্থার কথা বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী কাঠামোর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ অধিকাংশ নির্বাচনের প্রশাসন রাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে।

ফলে কেন্দ্রীয় সরকার কতটা তথ্য চাইতে পারে, ভোটার তালিকায় কতটা হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং ভোটযন্ত্র বা ব্যালটের ওপর ফেডারেল কর্তৃত্ব কতদূর বিস্তৃত হতে পারে—এসব এখন বড় আইনি প্রশ্ন।

রয়টার্সের ২০২৬ সালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে ফেডারেল সংস্থার পক্ষ থেকে ভোটার তথ্য ও নির্বাচনী সরঞ্জাম চাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্মকর্তারা এসব অনুরোধের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

অর্থাৎ ‘ভোট কারচুপি’ এখন শুধু নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্ক নয়; এটি ফেডারেল সরকার বনাম রাজ্যগুলোর নির্বাচনী ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।

পুরো ঘটনাপ্রবাহকে কয়েকটি ধাপে দেখা যায়।

প্রথম ধাপ—সন্দেহ: নির্বাচনে বিচ্ছিন্ন অনিয়মের বাস্তব ঘটনা থেকে বৃহত্তর জালিয়াতির আশঙ্কা তৈরি হয়।

দ্বিতীয় ধাপ—রাজনৈতিকীকরণ: কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা সেই আশঙ্কাকে নির্বাচনী প্রচারের অংশ করেন।

তৃতীয় ধাপ—তথ্য পুনরাবৃত্তি: একই দাবি বক্তৃতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন অংশে বারবার প্রচারিত হয়।

চতুর্থ ধাপ—প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: নির্বাচনী নিরাপত্তার নামে সরকারি তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ ও নীতিগত পরিবর্তনের দাবি ওঠে।

পঞ্চম ধাপ—আইনি সংঘাত: কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগ রাজ্যগুলোর সাংবিধানিক ক্ষমতা, ভোটার অধিকার ও প্রশাসনিক এখতিয়ারের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়।

২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রে এই শেষ দুটি ধাপ বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ভোট কারচুপির তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—একটি অভিযোগ বারবার তদন্তের দাবি তুলতে পারে, কিন্তু তদন্তের ফল যদি অভিযোগকে সমর্থন না করে, তখনও একই অভিযোগ নতুন নামে ফিরে আসতে পারে।

২০২৬ সালের রয়টার্স অনুসন্ধান সেই ধারাবাহিকতার একটি উদাহরণ দিয়েছে। ২০২০ সালের ভোটযন্ত্র নিয়ে যে দাবিগুলো আদালত, নির্বাচন কর্মকর্তা ও আগের তদন্তে সমর্থন পায়নি, সেগুলোর নতুন প্রমাণ খোঁজার চেষ্টা সরকারি কাঠামোর ভেতরেও হয়েছে।

এখানে মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মূল প্রশ্নটি শুধু ‘কারচুপি হয়েছিল কি না’—এতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হয়েছে: নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে কেন্দ্রীয় সরকার কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, রাজ্যগুলোর নির্বাচনী কর্তৃত্বের সীমা কোথায়, এবং কোনো গুরুতর অভিযোগের তদন্তে প্রমাণের মানদণ্ড কী হওয়া উচিত?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। তবে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল ব্যাপক কারচুপির কারণে পরিবর্তিত হয়েছিল—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত যে তদন্ত ও পর্যালোচনাগুলো হয়েছে, সেগুলো থেকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে রাজনৈতিক অভিযোগ, সম্ভাব্য নিরাপত্তাগত দুর্বলতা এবং প্রমাণিত নির্বাচনী জালিয়াতি—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখা বিষয়টি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।