উত্তেজনার মধ্যেই সাগরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লো উত্তর কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যেই সাগরের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে উত্তর কোরিয়া। শনিবার (৩ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দেশটির পূর্ব উপকূলীয় শহর ওনসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয় বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী।

দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে পূর্ব সাগরে গিয়ে পড়ে। ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট ধরন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্লেষণ চালাচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সম্ভাব্য আরও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে তথ্য বিনিময় অব্যাহত রয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষও উৎক্ষেপণের বিষয়টি শনাক্ত করেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রটি তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে গিয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে এপি।

নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনাটি ঘটল দুই কোরিয়ার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধির কয়েক দিনের মধ্যেই।

গত ২১ সেপ্টেম্বর অসামরিকীকৃত অঞ্চলে বা ডিমিলিটারাইজড জোনে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমান্ডের তদন্তে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইন থেকেই বিস্ফোরণটি ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। জাতিসংঘ কমান্ড ঘটনাটিকে কোরীয় যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেছে।

তবে উত্তর কোরিয়া ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং দক্ষিণ কোরিয়ার তদন্তের ফলকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। শুক্রবারও তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার দাবিকে উপহাস করেন এবং সীমান্ত নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

উত্তর কোরিয়া কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সূত্রগুলো ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ও গতিপথ বিশ্লেষণ করছে।

ইয়োনহাপ জানিয়েছে, এটি মধ্যপাল্লার বা মধ্যবর্তী পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি পরিবর্তিত সংস্করণ হতে পারে। একটি সরকারি সূত্রের ধারণা, এটি ১২ আগস্ট ওনসান এলাকা থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের মতো হতে পারে, যেটিকে কম পাল্লায় পরীক্ষা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল।

তবে ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রকৃত ধরন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।

নতুন উৎক্ষেপণটি উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক ধারাবাহিক অস্ত্র পরীক্ষারই অংশ। মাত্র ১৩ দিন আগে, ২০ সেপ্টেম্বর ওনসান এলাকা থেকে দুটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল পিয়ংইয়ং। সেগুলো যথাক্রমে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার ও ৬০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করেছিল।

এ বছর উত্তর কোরিয়া একাধিকবার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এসব উৎক্ষেপণের কিছু ক্ষেত্রে পিয়ংইয়ং নতুন অস্ত্রব্যবস্থা পরীক্ষা করেছে বলে জানিয়েছে, আবার কিছু উৎক্ষেপণ দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তর জরুরি বৈঠক করেছে। পরিস্থিতি মূল্যায়নের পাশাপাশি সম্ভাব্য পরবর্তী উৎক্ষেপণ এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে তথ্য বিনিময় করছে এবং সম্ভাব্য আরও উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড জানিয়েছে, তারা উৎক্ষেপণের বিষয়ে অবগত এবং মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ করছে। তাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই উৎক্ষেপণ যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড, মার্কিন সেনা বা মিত্রদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি।

উৎক্ষেপণের সময়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপ পুনরায় শুরু এবং সামরিক উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

১ অক্টোবর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের ভাষণে লি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আস্থা পুনর্গঠন ও সংলাপ শুরুর আহ্বান জানান। তার প্রশাসন সামরিক উত্তেজনা কমানোর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে।

কিন্তু পিয়ংইয়ংয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সেই উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং কিম ইয়ো জং দক্ষিণ কোরিয়ার সংলাপের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।