যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের উপকূল থেকে আরও দূরে অবস্থান নেওয়ার প্রেক্ষাপটে নিজেদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তেহরান মনে করছে, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা আরও বাড়ানো জরুরি।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আকরামিনিয়া বলেন, যুদ্ধ চলাকালে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা অবশ্যই বাড়াতে হবে এবং সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে মার্কিন বাহিনীর কিছু অংশ ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। ফলে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংঘাতে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানোকে তেহরান সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।
সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনীতির বার্তা
তবে ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও খোলা রাখার কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি রোববার (৪ অক্টোবর) বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, তেহরান আশা করছে ওয়াশিংটন কূটনীতির পথ বেছে নেবে।সতবে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক পদক্ষেপ নিলে ইরান আগের চেয়ে শক্তিশালী জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত বলেও সতর্ক করেন তিনি। আরাকচির ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার সামরিক সংঘাতের পথ বেছে নেয়, তাহলে ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে আরও শক্তিশালী এবং দেশটি নিজেদের প্রতিরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।
এর আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক হামলা পুনরায় শুরু করলে ইরান আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী পাল্টা জবাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আওতা যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ছাড়িয়ে মার্কিন সামরিক অভিযানে সহযোগিতাকারী দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থান পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে ওই প্রতিবেদনে কয়েকজন ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়।
হরমুজ নিয়ে অচলাবস্থা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সম্প্রতি বলেছেন, তেহরানের নির্ধারিত সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি পুনরায় খুলবে না। অন্যদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, মার্কিন নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
সংঘাতে নতুন মাত্রার আশঙ্কা
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়ানোর ঘোষণা এবং সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলার ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। তবে একই সময়ে তেহরান কূটনীতির পথও খোলা রাখছে। ফলে একদিকে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তুতি এবং অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা এই দ্বৈত কৌশলই বর্তমানে ইরানের অবস্থানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে হরমুজ প্রণালি, উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা তিনটিই সম্ভাব্য সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে নতুন করে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হবে কি-না, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা এগোয় তার ওপর।