ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘দ্বিচারিতা’ স্পষ্ট

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে এক ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি নেতার প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্যের জেরে তাকে নির্বাচনের দৌড় থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ থাকা কট্টর ডানপন্থি নেতারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এ কারণে ইসরায়েলের নির্বাচনি ব্যবস্থায় দ্বৈত নীতি বা ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’-এর অভিযোগ উঠেছে। 

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সামি আবু শেহাদেহ জাফার একজন ইতিহাসবিদ। তিনি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী দল বালাদের নেতা। দলটি ইসরায়েলের সব নাগরিকের সমান অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়।  ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে সদস্য ছিলেন। গাজা যুদ্ধ নিয়ে তার একটি পুরোনো লেখাকে কেন্দ্র করে এবারের বিতর্কের সূত্রপাত। 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পরদিন ওই লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে তিনি ওই ঘটনাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তার প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেলও আবু শেহাদেহকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার পক্ষে অবস্থান নেন। তার বক্তব্য ছিল, ওই লেখার ভাষা সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আদালতের সতর্কতার পর সরে দাঁড়ালেন
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি আবু শেহাদেহকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টি ওঠে। আদালত তাকে অযোগ্য ঘোষণা করার বিষয়ে সতর্ক করার পর আবু শেহাদেহ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। তিনি এই সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রের জন্য ‘ঐতিহাসিক বিপর্যয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। আদালতে শুনানির সময় তিনি বলেন, তিনি সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন করেন না। তবে তার লেখার একটি অনুচ্ছেদের ভাষা ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন। শেহাদেহর দাবি, তার উদ্দেশ্য ছিল সংঘাতকে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নেওয়ার আহ্বান জানানো।

আরব দলগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার চেষ্টা
শুধু আবু শেহাদেহ নন, এর আগে আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও নেতাকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি হাদাশ দলের রাজনীতিক ওফের ক্যাসিফ এবং দুটি প্রধান আরব-সমর্থিত নির্বাচনি জোটকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ছিল বালাদ, হাদাশ ও তায়ালকে নিয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আম বা ইউনাইটেড আরব লিস্ট। তবে সুপ্রিম কোর্ট পরে ওই দুই জোট ও ক্যাসিফের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে দেয়।

কট্টর ডানপন্থিদের ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত
একই সময়ে ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের দলকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও উঠেছিল। তবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। ফলে তাদের দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ইসরায়েলের মৌলিক আইনের ৭এ ধারায় কোনো প্রার্থী বা দলকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে। কোনো দল যদি ইসরায়েলের ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে চরিত্র অস্বীকার করে, বর্ণবাদে উসকানি দেয় বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড সমর্থন করে, তাহলে তাকে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে, বেন-গভির ও স্মোটরিচের দলকে নিষিদ্ধ করার মতো যথেষ্ট আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়নি। 

বেন-গভির ও স্মোটরিচের বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক
ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে বেন-গভির ও স্মোটরিচের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও নরওয়ে তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। দেশগুলো তাদের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিল।

সাম্প্রতিক সময়েও বেন-গভির গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায়’ চলে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তিনি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের চলে যাওয়ার পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। স্মোটরিচও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা দুজনই গাজা স্থায়ীভাবে দখল করা এবং সেখানে ইহুদি বসতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলেছেন। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইসরায়েলে গণতন্ত্রে দুই ধরনের মানদণ্ড
আবু শেহাদেহের প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্কের পর ইসরায়েলের নির্বাচনি ব্যবস্থায় দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ জোরালো হয়েছে। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজ্জারের মতে, এই ঘটনা ইসরায়েলি গণতন্ত্রের ‘দুই স্তরের’ চেহারা প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি ইহুদি রাজনীতিকদের জন্য একটি মানদণ্ড এবং ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য আরেকটি মানদণ্ড তৈরি করা হয়েছে।

নাজ্জারের মতে, ইহুদি কট্টরপন্থি রাজনীতিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে জায়গা দেওয়া হলেও ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বক্তব্যকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আরব পার্সপেক্টিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা জায়দোন আলকিনানি বলেন, বিষয়টি শুধু একজন প্রার্থীকে ঘিরে নয়। তার মতে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবেই দেশটির ইহুদি ও জায়নবাদী চরিত্র ধরে রাখার জন্য তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েলি নির্বাচনে ফিলিস্তিনিদের চ্যালেঞ্জ
ইসরায়েলের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা নতুন নয়। আইনি অধিকার সংগঠন আদালাহর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩, ২০১৩, ২০১৫, ২০২০ ও ২০২২ সালের নির্বাচনেও আরব প্রার্থী ও দলগুলোর বিরুদ্ধে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে।

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। তবে ঐতিহাসিকভাবে নির্বাচনে তাদের ভোট দেওয়ার হার ইহুদি ইসরায়েলিদের তুলনায় কম। ইসরায়েলের পার্লামেন্টে কোনো দলকে আসন পেতে জাতীয় ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। এ কারণে ছোট আরব দলগুলো প্রায়ই জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। নাহলে ভোট পেলেও পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব হারানোর ঝুঁকি থাকে। ফলে আবু শেহাদেহের প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্ক শুধু একজন রাজনীতিকের নির্বাচন থেকে বাদ পড়ার ঘটনা নয়। এটি ইসরায়েলি রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব, সমঅধিকার এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় আইনের সমান প্রয়োগের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা