যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় অব অস্টিনের গবেষকরা ওকলাহোমার ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশোধন করেছেন। গবেষণার এই নতুন ফলাফল পৃথিবীর জীবনের ইতিহাসের প্রধান প্রধান ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ তাত্পর্যপূর্ণ হতে পারে।
ওকলাহোমার এমস (Ames) শহরের মাটির নিচে একটি সুবিশাল উল্কাপাতের গর্ত বা ইমপ্যাক্ট স্ট্রাকচার লুকিয়ে রয়েছে, যা ভূগর্ভে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত। পলির স্তরে ঢাকা পড়ে গেলেও বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিকভাবে গর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি খনিজ তেল ও গ্যাসের একটি প্রধান উৎস।
যেভাবে একটি প্রাচীন উল্কা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণায় বদল এলো
বছরের পর বছর ধরে ধারণা করা হতো যে, এমস শহরের এই গর্তটি প্রায় ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ বছর আগের। সেই সময় উত্তর আমেরিকা জুড়ে হওয়া একের পর এক বড় ধরনের উল্কাপাতের ঘটনার (যা 'অর্ডোভিশিয়ান উল্কা ঘটনা' বা Ordovician Meteor Event নামে পরিচিত) অংশ মনে করা হতো এটিকে। ওই সময়ে একসঙ্গে এত বেশি উল্কাপাত ঘটেছিল যে, কিছু গবেষক ধারণা করেছিলেন যে মিডল অর্ডোভিশিয়ান যুগে শনির বলয়ের মতো উল্কাপিণ্ডের একটি বলয় হয়তো পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছিল।
তবে ইউটি অস্টিনের গবেষকদের নতুন গবেষণা বলছে, এমস শহরের উল্কাপাতটি সেই অর্ডোভিশিয়ান ঘটনার অংশ নয়। উল্কাপাতের ঘাতে পরিবর্তিত হওয়া গ্রানাইট পাথর থেকে সংগৃহীত জিরকন ক্রিস্টাল (Zircon crystals)-এর বয়স নির্ধারণ করে গবেষণা দলটি জানিয়েছে যে, উল্কাটি মূলত প্রায় ৩৭ কোটি বছর আগে 'লেট ডেভোনিয়ান' যুগে আছড়ে পড়েছিল। এর ফলে এই গর্তটি বিজ্ঞানীদের আগের ধারণার চেয়েও প্রায় ১০ কোটি বছর কম বয়সী হিসেবে প্রমাণিত হলো।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য ডিপার্টমেন্ট অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেসের সহযোগী অধ্যাপক এলিজাবেথ ক্যাটলোস জানান, তারা যে পদ্ধতিই ব্যবহার করেছেন না কেন, প্রতিবারই ফলাফলে এটি অপেক্ষাকৃত কম বয়সী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। এ সংক্রান্ত গবেষণাটি ‘মিটিওরিটিক্স অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
কেন আগের হিসেব বিভ্রান্তিকর ছিল?
এই গবেষণার আগে এমস গর্তের বয়স নির্ধারণের জন্য কেবল জীবাশ্ম বা জৈবিক প্রমাণের ওপর নির্ভর করা হয়েছিল। সেখানে পাথরের স্তরে 'কোনোডন্ট' (Conodont) নামের একটি অতি প্রাচীন ইল-জাতীয় প্রাণীর দাঁত পাওয়া গিয়েছিল, যা অর্ডোভিশিয়ান যুগের।
অধ্যাপক ক্যাটলোস ব্যাখ্যা করেন, উল্কা আছড়ে পড়ার আগেই হয়তো ওই জীবাশ্মগুলোর বয়স কোটি বছর হয়ে গিয়েছিল। উল্কাপাতের প্রচন্ড আঘাতে মাটির ভেতরের পুরোনো উপাদান উলটপালট হয়ে যায় এবং জীবাশ্মগুলো ওই পাথরের সঙ্গে মিশে যায়, যা বিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করেছিল।
তবে জিরকন ক্রিস্টাল দিয়ে বয়স নির্ধারণের বিষয়টি একেবারে ভিন্ন সময়রেখা তুলে ধরেছে। এটি নিশ্চিত করে যে গর্তটি অর্ডোভিশিয়ান যুগের হতে পারে না। বরং এর নতুন সময়সীমা নির্দেশ করে যে এটি প্রায় ৩৭ কোটি ২০ লাখ বছর আগের ‘ফ্রাসনিয়ান-ফামেনিয়ান’ গণবিলুপ্তির সময়ের কাছাকাছি, যে সময়ে পৃথিবীর বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
ক্ষুদ্র জিরকন ক্রিস্টালে সংরক্ষিত উল্কাপাতের ইতিহাস
গবেষণার সহ-লেখক এবং জ্যাকসন স্কুল অব জিওসায়েন্সেসের ডিন ড্যানি স্টকলি বলেন, পৃথিবীর সুদূর অতীতের ঘটনাগুলোর নিখুঁত সময়সীমা নির্ধারণে 'জিরকন ইউ-পিবি' (Zircon U-Pb) বয়স নির্ধারণ পদ্ধতি অন্যতম নির্ভুল উপায়। উল্কাপাতের তীব্র চাপে সৃষ্টি হওয়া অনুবিক্ষণীয় পরিবর্তনগুলোও ধরে রাখতে পারে জিরকন ক্রিস্টাল।
জিরকন সত্যিই উল্কাপাতের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল কিনা তা নিশ্চিত করতে নাসা (NASA)-র সহায়তা নেয় গবেষক দলটি। জিরকন ক্রিস্টাল যখন উল্কাপাতের চরম তাপ ও চাপের সম্মুখীন হয়, তখন একটি বিশেষ উপায়ে এটি পুনর্বিন্যস্ত হয়। নাসার ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এই পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ক্রিস্টালটি উল্কাপাতের প্রত্যক্ষ প্রভাব ধারণ করে আছে।
গণবিলুপ্তির জটিল ধাঁধায় নতুন তথ্য
ক্যাটলোসের মতে, পৃথিবীর গণবিলুপ্তি ও অন্যান্য বড় ঘটনাগুলোর নির্ভুল সময়সীমা জানার মাধ্যমে আমাদের পৃথিবী সময়ের সাথে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তা বোঝা সম্ভব। এর মাধ্যমে একটি বড় প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে—গণবিলুপ্তি কি মূলত মহাশূন্য থেকে আসা উল্কাপাতের কারণে ঘটেছিল, নাকি বিশাল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো পৃথিবীর ভেতরের প্রক্রিয়ার কারণে হয়েছিল?
তিনি জানান, এই গবেষণার মাধ্যমে অর্ডোভিশিয়ান উল্কা ঘটনার একটি বড় উপাদানকে সরিয়ে 'ফ্রাসনিয়ান-ফামেনিয়ান' গণবিলুপ্তির তালিকায় যুক্ত করা গেছে।
উলেখ্য, প্রাক্তন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী অ্যান্ড্রু পারিসি ও অন্যতম সহ-লেখক মাইকেল ব্রুকফিল্ড এই গবেষণার কাজ শুরু ও পরিচালনায় বড় অবদান রেখেছিলেন, যা প্রকাশের আগেই তারা প্রয়াত হন।