দুবাই থেকে ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে ওমানি ফার্স্ট অফিসার বা সহ-পাইলট হাইজ্যাক সিগন্যাল পাঠিয়ে বিমানটি ক্র্যাশ করার চেষ্টা করলে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিমানটি ভূপাতিত বা 'শুট ডাউন' করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য উঠে এসেছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, বিমানটি জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করার পর সহ-পাইলট হামাম আল-হামামি ককপিটের ভেতরে ভারতীয় প্রধান পাইলট স্মিত মাচ্ছারকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন এবং বিমানটি ভূপাতিত করার চেষ্টা করেন। বিমানটিতে ১৭০ জনেরও বেশি যাত্রী ও ক্রু ছিলেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন ইসরায়েলি নাগরিক।
সিবিএস নিউজ তাদের সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, তেল আবিব দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের পরিস্থিতি আশঙ্কা করে আসছিল এবং ৯/১১-এর মতো সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা মোকাবিলার প্রোটোকল ও অনুশীলন তাদের প্রস্তুত রাখা ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিকেলের দিকে বিমানটি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে হঠাৎ প্রায় ১৮ হাজার ফুট নিচে নেমে গেলে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ককপিটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে, কিন্তু ককপিট থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতিতে আগে থেকে নির্ধারিত জরুরি প্রোটোকল সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠিত হয়ে একটি কমান্ড সেন্টার স্থাপন করে।
তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করা হয় এবং ইসরায়েলের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটিকে লক্ষ্যবস্তু করার আগেই ইসরায়েল দেখতে পায় যে, বিমানটি তাদের সীমানায় না ঢুকে সৌদি আরবের দিকে মোড় নিয়েছে, যেখানে সৌদি কর্তৃপক্ষও তাদের নিজস্ব যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পুনরায় বিমানটিতে যোগাযোগের চেষ্টা করে। সূত্রে জানা গেছে, ততক্ষণে আহত ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছার সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে ককপিটের দরজা আনলক করতে সক্ষম হন। এরপর ককপিটে প্রবেশ করে ইসরায়েলি যাত্রী ও ফ্লাইদুবাইয়ের ক্রুরা হামলাকারীকে কাবু করে ফেলেন। বিমানে অফ- ডিউটিতে থাকা অপর দুই পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করান।
সিবিএস নিউজকে এক সূত্র জানিয়েছে, "ফ্লাইট ১০৭৩ যদি ইসরায়েলের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে চলে আসত, তবে ঘটনা খতিয়ে দেখতে ইসরায়েল জর্ডানের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান পাঠাত।"
যে প্রোটোকল মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়
হাইজ্যাক বা বিমান ছিনতাই সংক্রান্ত পরিস্থিতির জন্য ইসরায়েলের কঠোর প্রোটোকল রয়েছে। যদি গ্রাউন্ড কমান্ড বিমানের সঙ্গে সময়মতো যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, তবে ভেতরে কী ঘটছে তা পর্যবেক্ষণ করতে তেল আবিব যুদ্ধবিমান পাঠায়। নিয়ম অনুযায়ী, ইসরায়েলি ফাইটার পাইলটরা ককপিটের যতটা সম্ভব কাছাকাছি গিয়ে দৃশ্যমান যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন এবং কেবিনের যাত্রীদের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। ককপিটে কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়া গেলে এবং বিমানটি কোনো দাবি না জানিয়ে নিশ্চুপ থেকে ইসরায়েলের দিকে এগোতে থাকলে, বিমানটি ভূপাতিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
সূত্রে বলা হয়, অনিয়ন্ত্রিত বিমানকে আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে, আর এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক এখতিয়ার কেবল প্রধানমন্ত্রীর। ইসরায়েলের আজরিয়েলি ভবন, বিমানবন্দর বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিমানটি আছড়ে পড়লে শত শত মানুষের প্রাণহানি হতে পারে—সেই বিবেচনাতেই বিমানটি গুলি করে নামানোর প্রস্তুতি ছিল।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
ককপিটে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ওমানের নাগরিক হামাম আল-হামামি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হেফাজতে রয়েছেন। তদন্তকারীদের তিনি জানিয়েছেন, ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। ককপিটে পাইলটকে হত্যা করে বিমান নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আছড়ে ফেলার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এটি একক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হামলা (লোন-উলফ অ্যাটাক) বলেই মনে করছে, তবে চূড়ান্ত তদন্ত এখনও চলমান। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, আল-হামামি মাত্র ৮ মাস ধরে ফ্লাইদুবাইয়ে কর্মরত ছিলেন।