ওনাসিস মুনজ যে কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিনের সাথে যুক্ত ছিলেন, সেটির গুঞ্জন হঠাৎ থেমে গেল। মাথার ওপরের টিউব লাইটগুলো নিভে গিয়ে ভেনেজুয়েলার ভ্যালেন্সিয়ার এক ক্লিনিকের রুমটি অন্ধকারে ডুবে যায়। এটিই প্রথম নয়, যে সপ্তাহে তিনবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাঝপথে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্মুখীন হতে হয়েছে মুনজকে। তার অকেজো কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল ফিল্টার করতে না পারায় এই ডায়ালাইসিসই তার একমাত্র ভরসা।
ভেনেজুয়েলার কারাবোবো রাজ্যের অনেক অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে কয়েক দিন পরপর বিদ্যুৎ চলে যেত। কিন্তু ৩৪ বছর বয়সী মুনজ জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই লোডশেডিং দৈনন্দিন ব্যাপারে পরিণত হয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় সাত ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। ক্লিনিকের জরুরি ব্যাকআপ ব্যাটারিগুলো নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং ব্যাকআপ জেনারেটরটিও আর কাজ করছে না। বারংবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ায় তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটছে।
"বাড়ি ফিরে মনে হয় যেন একটা ম্যারাথন দৌড়ে এসেছি," মুনজ বলেন। কিন্তু বাড়িতে গিয়েও স্বস্তি নেই, কারণ সেখানেও বিদ্যুৎ নেই। প্রচণ্ড গরম ও মশার উৎপাতে তিনি বিশ্রাম নিতে পারেন না।
ভেনেজুয়েলাজুড়ে দীর্ঘায়িত বিদ্যুৎ বিভ্রাট সাধারণ মানুষকে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। গৃহস্থালি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবার বিদ্যুৎ সরবরাহ একেবারেই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকার বিদ্যুৎ রেশনিং করায় পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ক্ষুব্ধ জনগণ রাস্তায় নেমে হাঁড়ি-পাতিল বাজিয়ে (যা 'কাসেরোলাসো' নামে পরিচিত) ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কেউ কেউ রাস্তা অবরোধ করে টায়ারে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করছে। এই বিদ্যুৎ সংকট দেশটির তেল সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
মারাকাইবো শহরের আইনজীবী প্যাট্রিসিয়া কুয়েভা বলেন, "আমরা চূড়ান্ত হতাশ। সম্পদে এত ধনী একটি দেশ কীভাবে অন্ধকারে ডুবে থাকে, তা আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা বিশ্রাম নিতে পারি না, কাজ করতে পারি না, আমাদের শিশুরা কাঁদছে।"
'অ্যানোভা পলিসি রিসার্চ' (ANOVA Policy Research)-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬২.৮ শতাংশ পরিবার অর্থাৎ প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে দুটি পরিবারই প্রতিদিন লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩৭.১ শতাংশ। মাত্র ৬.৯ শতাংশ পরিবার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে।
সংকটের নেপথ্যের কারণসমূহ
এই জ্বালানি সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আগের সরকারগুলো অর্থনৈতিক দুর্বলতার জন্য বৈদেশিক নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছিল। আর বর্তমান রদ্রিগেজ প্রশাসন জলবায়ু সংক্রান্ত 'এল নিনো' প্রভাবকে দায়ী করছে। ভেনেজুয়েলার ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে তৈরি হয়, যা চরম খরা ও দাবদাহের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে শক্তি বিশেষজ্ঞ নেলসন হার্নান্দেজ মনে করেন, মূল দায় সরকারের গাফিলতির। তিনি বলেন, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং অবকাঠামোর প্রতি দীর্ঘদিনের চরম অবহেলা, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব এবং পুরোনো প্রযুক্তির ফল।
তিনি আরও নির্দেশ করেন যে, সরকারের তেল নিষ্কাশন নীতি পরিবর্তন এতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল খনি থাকা সত্ত্বেও দেশটির তেল শিল্প জাতীয়করণ করা হয়েছিল। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক অভিযানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ তেল খাতে বিদেশি বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত করেন। ওপেকের (OPEC) তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে তেল উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে দৈনিক ১.২০১ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে।
হার্নান্দেজ বলেন, তেল উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তেল খনিগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, তাই রেশনিং ও লোডশেডিংয়ের পুরো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপর। তেল খনি ও রিফাইনারির জন্য অন্তত ১,৬০০ মেগাওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
রদ্রিগেজ সরকার চলতি বছরের শেষ নাগাদ নতুন করে ১,৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং কোম্পানিগুলোকে নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা করার জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা জারি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংস্কার এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
জনজীবনে মানসিক প্রভাব
কারাবোবো রাজ্যের বেকারি মালিক মানুয়েল রেয়েস জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে নিয়মিত রুটি উৎপাদন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে হয়।
আরাগুয়া রাজ্যের মাইলেডি ব্লাঙ্কো জানান, বিদ্যুৎ যাওয়ার আগেই পরিবারের রান্নার কাজ শেষ করতে তাকে ভোর ৪টায় উঠতে হয়। তবে তার ছয় বছরের কন্যাসন্তান চরম মানসিক চাপে ভুগছে। স্কুলে, বাড়িতে এবং নাচ শেখার ক্লাসে পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিশুটি কেঁদে ফেলে এবং কতদিন এই অন্ধকার থাকবে তা জানতে চায়। পরবর্তীতে তাকে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়।
প্রতিবাদের আগুন ও হাঁড়ি-পাতিল বাজানোর শব্দ এখন ভেনেজুয়েলার সাধারণ পরিবারের নিত্যদিনের দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা