চীনা সোলার প্যানেল আমদানিতে ধস, বিদ্যুৎসংকটে আরও চাপে ইরান

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১১ পিএম

চলতি বছর ইরানের চীনা সোলার প্যানেল আমদানি ৮০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। দেশটি যখন বিদ্যুৎ ঘাটতিতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের উদ্যোগ বড় ধাক্কা খেল।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরানে চীনা সোলার প্যানেল রপ্তানির পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের এক-পঞ্চমাংশেরও কম। জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম্বারের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এই নয় মাসে চীন ইরানে পাঠিয়েছে মাত্র ১৩৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্যানেল। এর মূল্য প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার।

সংকট শুধু আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র ঘাটতি আছে, আছে বায়ুদূষণ ও খরা। ফলে তাপ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাড়ানোর সুযোগ সরকারের হাতে খুব কম। তহবিল থাকলেও এই পথে এগোনো কঠিন।

ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পার্লামেন্টের গবেষণা কেন্দ্রের হিসাবে, বিদ্যুৎ ঘাটতি এড়াতে দেশটিকে প্রতি বছর ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যোগ করতে হবে। গত কয়েক বছর সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এর খেসারত দিতে হচ্ছে সারা বছর। গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সংঘাতে দেশটির প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এপ্রিলে সোলার প্রকল্পের সরঞ্জাম মজুত রাখা একটি বড় গুদামেও হামলা হয়। ইরানের নবায়নযোগ্য ও জ্বালানি দক্ষতা সংস্থা (সাতবা) এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ ধরেছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার সৌরবিদ্যুতে জোর দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (আইরেনা) জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে ইরানের স্থাপিত সৌর সক্ষমতা আগের বছরের তুলনায় ১২৮ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৭৮১ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। আইইএর উদ্ধৃত এম্বারের তথ্য বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে চীন থেকে ইরানের সোলার প্যানেল আমদানি আগের বছরগুলোর তুলনায় দশ গুণেরও বেশি ছিল। অর্থাৎ সৌর সক্ষমতা আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিল।

তবে এ বছরের তীব্র পতন সেই ধারা ধরে রাখার চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য ইরানের হাতে আগে থেকে কী পরিমাণ সরঞ্জাম মজুত আছে, এসব পরিসংখ্যান থেকে তা বোঝা যায় না।

আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে ইরান

সাম্প্রতিক প্রসারের পরও আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় ইরান অনেকটাই পিছিয়ে।

২০২৫ সালে তুরস্ক ও সৌদি আরব প্রত্যেকে ইরানের প্রায় পাঁচ গুণ সৌর সক্ষমতা যোগ করেছে। মোট স্থাপিত সৌর সক্ষমতায় তুরস্ক ইরানের প্রায় ১২ গুণ, সৌদি আরব প্রায় সাত গুণ।

বায়ুবিদ্যুতে অবস্থা আরও খারাপ। ইরানের স্থাপিত বায়ু সক্ষমতা বছরের পর বছর ৩৭৮ মেগাওয়াটেই আটকে আছে। গত বছর তুরস্ক নতুন করে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ চালু করেছে, যা দেশটির মোট সক্ষমতা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটে নিয়ে গেছে।

বিশ্বজুড়ে গত বছর ৬৯২ গিগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নবায়নযোগ্য সক্ষমতা বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ, আর এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি সৌদি আরবের। দেশটি ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশিতে নিয়ে গেছে।

সৌর ও বায়ু মিলিয়ে তুরস্কের স্থাপিত সক্ষমতা সৌদি আরবের প্রায় দ্বিগুণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের প্রত্যেকের নবায়নযোগ্য সক্ষমতা প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট।

এর মধ্যে ইরান বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক দেশ থেকে নিট আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। এক দশক আগে দেশটির নিট বিদ্যুৎ রপ্তানি উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৮ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। গত বছর বাণিজ্য ভারসাম্য ঋণাত্মক হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়াতে তেহরান তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। পশ্চিমের প্রতিবেশী তুরস্ক থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি শুরুর বিষয়ে কথা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্য বাজারে চীনা রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে

ইরানের আমদানিতে ধসের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি বাজারে।

২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে বেশ কিছু আরব দেশে চীনা সোলার প্যানেল রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। পরে পুরো অঞ্চলেই চালান বাড়তে শুরু করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে চীনা চেম্বার অব কমার্সের এক প্রতিবেদনে সাংহাই মেটালস মার্কেটের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে চীনের ফটোভোলটাইক মডিউল রপ্তানি ২৩ দশমিক ৯২ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা আগস্টের চেয়ে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।

একই মাসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কে মোট রপ্তানি তিন গুণের বেশি বেড়ে ৩ দশমিক ৯৭ গিগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে একা সৌদি আরবই কিনেছে ২ দশমিক ৯ গিগাওয়াট।

এসব তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, ইরানের আমদানি পতনের কারণ শুধু এই অঞ্চলে চীনা রপ্তানি কমে যাওয়া নয়। তবে অন্য বাজারে সেপ্টেম্বরের ঘুরে দাঁড়ানো থেকে ইরানের নয় মাসের মন্দার আসল কারণ জানা যায় না।

বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়ছে, প্রতিবেশীরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এই অবস্থায় ইরান আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছে, অথচ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জরুরি।

সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

এটিটিআর
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত