ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৮১ সামরিক বিমান-হেলিকপ্টার-ড্রোন ধ্বংস

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮১টি সামরিক বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস)। মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআরএসের নতুন এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বা হারানো সামরিক সরঞ্জামের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে নজরদারি বিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন আকাশযান রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ১২টি F-15E Strike Eagle যুদ্ধবিমান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েতের আকাশে বন্ধুসুলভ গোলাবর্ষণের ঘটনায় ২ মার্চ তিনটি F-15 ধ্বংস হয়। প্রতিটির মূল্য ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী মাসে ইরানের আকাশে আরও একটি F-15 ভূপাতিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া জর্ডানের Muwaffaq Salti Air Base-এ ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর ইরানের বিমান হামলায় আরও আটটি F-15E ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বিমান পরে মেরামত করে পুনরায় কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

৪৫টি MQ-9 Reaper ড্রোনের ক্ষতি

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির তালিকায় রয়েছে অন্তত ৪৫টি MQ-9 Reaper ড্রোন। প্রতিটি ড্রোনের আনুমানিক মূল্য ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

এই ক্ষয়ক্ষতির ফলে মার্কিন বিমানবাহিনীর হাতে থাকা Reaper ড্রোনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মে মাসে মার্কিন বিমানবাহিনীর এক জেনারেল সিনেটে জানিয়েছিলেন, তখন বহরে কার্যকর Reaper-এর সংখ্যা নেমে প্রায় ১৩৫-এ দাঁড়িয়েছিল। অথচ বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয় মোতায়েনযোগ্য সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৮৯টি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া পঞ্চম প্রজন্মের F-35A Lightning II যুদ্ধবিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ১৯ মার্চ ইরানের হামলায় বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ ধরনের একটি F-35A-এর মূল্য ৯২ মিলিয়ন ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর আরেকটি বড় ক্ষতি হলো E-3 Sentry নজরদারি বিমান। সিআরএসের হিসাবে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি E-3 হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালের হিসাবে মার্কিন বিমানবাহিনীর বহরে ৩২টি E-3 Sentry ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এপ্রিল মাসে একটি A-10 Thunderbolt II স্থল আক্রমণকারী বিমান হারানোর কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে জর্ডানে হামলার সময় আরও একটি A-10 ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের তালিকা

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তালিকা অনুযায়ী— 

  • ১২টি F-15E Strike Eagle যুদ্ধবিমান।
  • ১টি F-35A Lightning II স্টেলথ যুদ্ধবিমান।
  • ২টি A-10 Warthog আক্রমণকারী বিমান।
  • ৭টি KC-135 Stratotanker আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান।
  • ১টি E-3 Sentry নজরদারি বিমান।
  • ২টি MC-130J Commando II বিশেষ অভিযানবিষয়ক বিমান।
  • ১টি HH-60W Jolly Green II উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার।
  • ১টি MQ-4C Triton উচ্চ-উচ্চতার দীর্ঘসময় উড্ডয়নক্ষম ড্রোন।
  • ৩টি MQ-1 বহুমুখী ড্রোন।
  • ১টি AH-64 Apache অ্যাটাক হেলিকপ্টার।
  • ৪টি AH-6 Little Bird হালকা আক্রমণকারী হেলিকপ্টার।
  • ১টি MH-60 Sea Hawk সামুদ্রিক হেলিকপ্টার।

যুদ্ধের ব্যয়ও বাড়ছে

ইরান যুদ্ধের সামরিক ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসাবে, গত মাসে যুদ্ধের মোট ব্যয় বেড়ে ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। আগস্টের হিসাবের তুলনায় এটি প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি।

একই সময়ে অস্ত্রের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের আগের হিসাবে অস্ত্রের খরচ যেখানে ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ছিল, সেখানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সর্বশেষ হিসাবে তা বেড়ে ২৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।

অর্থাৎ, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতিই নয়, যুদ্ধ পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয়ও বাড়ছে।

তবে ক্ষয়ক্ষতির এসব সংখ্যা ও আর্থিক হিসাব সংশ্লিষ্ট মার্কিন সরকারি নথি ও প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ‘ধ্বংস’, ‘হারানো’ ও ‘ক্ষতিগ্রস্ত’—এই শ্রেণিগুলোর অর্থ এক নয়; ফলে মোট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার ক্ষেত্রে এগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।