হরমুজে হামলার আশঙ্কায় বাড়ছে তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বৃহস্পতিবার এশীয় বাণিজ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ০১:১৬ জিএমটি পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ১ দশমিক ৩৩ ডলার বা ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৫৩ ডলারে পৌঁছেছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দামও বেড়েছে। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট -এর দাম ১ দশমিক ১১ ডলার বা ১ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ৩৯ ডলারে লেনদেন হয়েছে।

তেলের বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন অঞ্চল থেকে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগকে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বাজারে এ ধরনের আশঙ্কা দেখা দিলেই অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি প্রিমিয়াম যোগ করতে শুরু করেন। এর ফলে প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাহাজে হামলা বা হামলার আশঙ্কা তৈরি হলে অনেক জাহাজকে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়ে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী কোনো অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ফলে তেলের বাজারে এখন শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, নিরাপদে জ্বালানি পরিবহন করা যাবে কি না—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৫৩ ডলারে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির বিল বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার মূল্যেও পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব জ্বালানি তেল, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে।

একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি আমদানির মূল্য—সবগুলো বিষয় মিলিয়ে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এক দিনের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি স্থানীয় বাজারে একই মাত্রায় প্রতিফলিত হয় না। স্থানীয় জ্বালানি মূল্যের ক্ষেত্রে আমদানি মূল্য, কর-শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, মুদ্রার বিনিময় হার এবং সরকারি মূল্য নির্ধারণ নীতিসহ বিভিন্ন বিষয় প্রভাব ফেলে।

তেলের বাজারে এখন সবচেয়ে বড় নজর হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির দিকে। সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকে কি না, হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমে কি না এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কতটা নির্বিঘ্ন থাকে—এসব বিষয় আগামী দিনগুলোতে তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

যদি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, তাহলে বর্তমান ঝুঁকি-প্রিমিয়াম কমে তেলের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু হরমুজে সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।