গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৫

হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার তৃতীয় বার্ষিকীর দিনে বুধবার (৭ অক্টোবর) গাজায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তিন বছর আগে ৭ অক্টোবর হামলায় নিহত ৩০০ জনের বেশি মানুষের স্মরণে নোভা সঙ্গীত উৎসবের স্থানে পরিবারের সদস্যরা ভোরে জড়ো হন। এ সময় গাজার দিক থেকে সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। 

গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতাল জানিয়েছে, রাতভর ইসরায়েলি হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ নিহতদের একজনকে মোহাম্মদ তামুস হিসেবে শনাক্ত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তিনি তাদের একজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ হামাস-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের অধীনে জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে।অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর তারা হামাসের দুই সদস্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, নিহতদের একজন ইসরায়েলি সেনাদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ‘হলুদ রেখা’ এলাকায় বিস্ফোরক পুঁতে রেখেছিলেন।

তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি ও হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর সীমা চিহ্নিত করে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলায় নিহতদের একজন মোহাম্মদ তামুস। তাদের দাবি, তিনি হামাসের সামরিক শাখার একজন স্নাইপার ছিলেন এবং একই সঙ্গে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থায় কাজ করতেন। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে নাসের হাসপাতাল জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় ৬০ বছর বয়সী হিশাম ইব্রাহিম আবু মুস্তফা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন।

হাসপাতালটি আরো জানিয়েছে, খান ইউনিসের দক্ষিণে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত জিয়াদ জারাবের মরদেহ সেখানে আনা হয়েছে। ওই হামলাতেও কয়েকজন আহত হন। এ ছাড়া বিকেলে আল-বুরাক ক্যাম্পের একটি তাঁবুতে হামলায় আরো একজন নিহত হয়েছেন বলে হাসপাতালটি জানিয়েছে। সর্বশেষ হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এএফপিকে জানিয়েছে, তারা একজন ‘সামরিক ব্যক্তিকে’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে নিহত বা আহত অন্যদের বিষয়ে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

গাজায় যুদ্ধ শুরুর তিন বছর পরও পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা এখনও অত্যন্ত কঠিন। গাজা শহরের বাসিন্দা মাহমুদ আবু হাসিরা বলেন, তিন বছর ধরে চলা অবরোধ, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে গাজা এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

গাজার লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনো তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে। এসব আশ্রয় সমুদ্রসৈকত কিংবা বোমায় ধ্বংস হওয়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের পাশে গড়ে উঠেছে। গাজার উত্তরের প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর বেইত হানুনের বাসিন্দা বাসাম নাসের বলেন, যুদ্ধের শুরুতেই তিনি বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ‘একসময় আমাদের নিজেদের বাড়ি ছিল। এখন আমরা প্রিয়জনদের হারিয়েছি, যাদের মরদেহ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছে।’

ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে বেইত হানুনসহ গাজার সীমান্তবর্তী বেশ কিছু এলাকা রয়েছে। অন্যদিকে, গাজার বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি হামাস-নিয়ন্ত্রিত বাকি এলাকায় বসবাস করছে। যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল গাজায় ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। তবে গাজার বাসিন্দারা বলছেন, তাদের জীবন এখনো অত্যন্ত কঠিন। গাজা শহরের বাসিন্দা আহমেদ নাসের বলেন, ‘যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ আমাদের ক্ষুধার্ত, ভীত ও বাস্তুচ্যুত করেছে। আমরা তাঁবুতে থাকছি এবং নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে লড়াই করছি।’

হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজার প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীই কোনো না কোনো সময় বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ৭৪ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় আরো ১ হাজার ৪৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।