যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আগুন নিয়ে না খেলতে’ সতর্ক করলেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ইরানের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বৈরী বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ ইবন আল-রেজা। তিনি বলেছেন, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা ‘আগুন নিয়ে খেলার’ শামিল।

সোমবার (১২ অক্টোবর) দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্কিন কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ‘অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর ভাষ্য, ইরান সম্পর্কে বিদ্বেষ ও ক্ষোভপূর্ণ বক্তব্য যাঁরা দেন, তাঁরা হয় ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না, অথবা কৌশলগত বিষয়গুলোকে ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করেন।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের উপলব্ধি একটি বড় ভুল এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক কৌশলগত হিসাবের ভুল।’

ইবন আল-রেজা সতর্ক করে বলেন, বিপদ শুধু প্রতিপক্ষের দুঃসাহসিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইতিহাস ও সংস্কৃতির পার্থক্যকে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের ভিত্তিতে পরিণত করার প্রচেষ্টাই আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

তাঁর ভাষায়, ‘সভ্যতার সংঘাতের পথে এগোনো মানে আগুন নিয়ে খেলা।’ এ ধরনের সংঘাত উসকে দিলে তার বিস্তারের সীমা, পরিণতি কিংবা শেষ কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এর প্রভাব কেবল অন্যদের ওপর সীমাবদ্ধ রাখার নিশ্চয়তাও কেউ দিতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রুবিওর বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্য এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে দেওয়া এক ভাষণকে কেন্দ্র করে ইরানে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে।

ওই ভাষণে রুবিও প্রাচীন গ্রিস ও পারস্যের যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮০ সালে পারস্যের রাজা প্রথম জার্কসিসের বাহিনীর এথেন্স দখলের ঘটনাকে বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে পশ্চিমা সভ্যতার প্রতিরোধের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বের সমালোচনা করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ তেহরানে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

এর জবাবে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইতিহাসের আরেকটি ঘটনা সামনে আনেন।

তাঁরা ২৬০ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের রাজা প্রথম শাপুরের বাহিনীর হাতে রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের বন্দি হওয়ার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেন। রেজাই সতর্ক করে বলেন, কেউ ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুললে সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির জন্যও তাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

অন্যদিকে, ইরানের সংস্কৃতিমন্ত্রী রেজা সালেহি-আমিরি পশ্চিমা রাজনীতিকদের দেশটির সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করার আহ্বান জানান। তিনি ইরানকে হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতা এবং বিশ্ব ইতিহাসের এক স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করেন।

ইতিহাসের বিতর্ক, বর্তমানের ঝুঁকি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামরিক উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাচীন সভ্যতার সংঘাতকে বর্তমান ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দেওয়া উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাই তুলে ধরেছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্যকে আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের অজুহাত করা উচিত নয়। কারণ, এমন সংঘাত শুরু হলে তার পরিণতি কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।