প্রামাণ্যচিত্র নাজা’য় সাক্ষাৎকারদাতাদের বিচারের নির্দেশ নেতানিয়াহুর

গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড নিয়ে নির্মিত অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র ‘নাজা’র সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া ইসরায়েলি সেনা ও কর্মকর্তাদের পরিচয় প্রকাশ এবং তাদের বিচারের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাস্বার্থের ক্ষতি করার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত ও বিচার শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রযোজনায় নির্মিত পুরস্কারজয়ী এই প্রামাণ্যচিত্র পরিচালনা করেছেন অস্কারজয়ী নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল শোর। এতে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে ছবিটি। বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে এটি দেখানো হবে।

ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারা, দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনিকে পাঠানো এক চিঠিতে নেতানিয়াহু মানহানিকর এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত বা এতে উপস্থিত সবার পরিচয় দ্রুত শনাক্ত করতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। চিঠিতে তিনি গুরুতর তথ্য-নিরাপত্তা লঙ্ঘন, ফৌজদারি মানহানি এবং ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাস্বার্থের ক্ষতি করার অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত ও বিচার শুরুর আহ্বান জানান।

গত মাসে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘নাজা’র প্রথম প্রদর্শনী হয়। উৎসবের ইতিহাসে দীর্ঘতম করতালির পর ছবিটি বিশেষ জুরি পুরস্কার পায়। ছবিটির নাম নেওয়া হয়েছে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত একটি সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে, যা কোনো বিমান হামলায় কতজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হতে পারেন, তার হিসাব বোঝাতে ব্যবহার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইসরায়েল সরকার। ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল শোরের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তোলা হয়েছে। সরকারপন্থিরা ইসরায়েলে ফিরলে তাদের হয়রানি করার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি সাভিয়নে শোরের বাবা-মায়ের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ করে ‘বিশ্বাসঘাতকদের মৃত্যুদণ্ড’ স্লোগানও দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াল জামির ছবিটিকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার অভিযোগ, এতে মিথ্যা ও রক্তের অপবাদ ছড়ানো হয়েছে। এর আগে তিনি ছবিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া সেনাদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সামরিক ও আইন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে সামরিক অ্যাডভোকেট জেনারেল ইতাই ওফির বলেছেন, ফৌজদারি মামলা করতে হলে নিরাপত্তা লঙ্ঘন বা গোপন তথ্য প্রকাশের প্রমাণ প্রয়োজন। অবশ্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি। কঠোর শর্ত পূরণ হলেই কেবল তথ্যসূত্রের পরিচয় প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি সাংবাদিকের প্রতিনিধিত্বকারী ইউরোপীয় সাংবাদিক ফেডারেশনের মহাসচিব রিকার্ডো গুতিয়েরেস বলেন, ‘এসব হুমকি সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর স্পষ্ট প্রচেষ্টা। তারা কেবল নৈতিক মানদণ্ড মেনে এবং জনস্বার্থে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় আমি অবাক নই। এটি নিশ্চিত করে যে গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও চলমান গণহত্যার অভিযোগ আড়াল করতে এই সরকার যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।’

দ্য গার্ডিয়ানের এক মুখপাত্র বলেন, নির্মাতাদের ইসরায়েলি নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর এবার সরকার তাদের সাংবাদিকতার তথ্যসূত্রের বিরুদ্ধে তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছে। তার মতে, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো থেকে দৃষ্টি সরানো। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে সাংবাদিকদের হুমকি বা হয়রানির শিকার হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’, হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম ‘লোকাল কল’ এবং দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে ‘নাজা’। চলতি মাসের শুরুতে দ্য গার্ডিয়ানের এক মুখপাত্র জানান, সাক্ষ্যগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে কঠোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ফাঁস হওয়া গোপন নথি, নির্দিষ্ট হামলার বিস্তারিত যাচাই এবং ছবিতে ক্যামেরার সামনে উপস্থিত না হওয়া আরও অনেক গোপন সাংবাদিকতার তথ্যসূত্রের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

মুখপাত্রটি আরও জানান, গত তিন বছরে ছবিটির নির্মাতারা গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানেন এমন ১০০ জনের বেশি ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাদের মধ্যে হামলার অনুমোদন দেওয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

এদিকে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েল সরকার অনলাইনে ‘নাজা: দ্য রিয়েল স্টোরি’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রকল্প প্রচার করছে। মূল প্রামাণ্যচিত্রের ধরন অনুকরণ করে নির্মিত এ প্রকল্পের লক্ষ্য, ‘নাজা’র অনুসন্ধানী তথ্য ও উপসংস্থানকে চ্যালেঞ্জ করা। প্রকল্পটির নির্মাতা ইসরায়েলি আইনজীবী ও সেনাবাহিনীর রিজার্ভ সদস্য এরিয়েল আভারবুখ একে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার অভিযোগ থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরাতেই এ উদ্যোগ।

অন্যদিকে, লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধানসহ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আব্রাহাম ও শোরের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, প্রতিশোধ বা হয়রানির ভয় ছাড়াই কঠিন ও জরুরি বিষয় নিয়ে কাজ করার অধিকার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের রয়েছে।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান