ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রখ্যাত মহাকাশবিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার প্রতীক এ পি জে আবদুল কালামের জন্মদিন আজ (১৫ অক্টোবর)। তাঁর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদান যেমন ভারতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সহায়তা করেছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে শেখানো, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা এবং জ্ঞানকে দেশ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও তাঁকে দিয়েছে বিশেষ পরিচিতি। এ কারণেই দিনটি ভারতে এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক আলোচনায় ‘বিশ্ব ছাত্র দিবস’ বা World Students’ Day নামে পরিচিত।
তবে এ দিবসের ইতিহাস নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। জাতিসংঘ ১৫ অক্টোবরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব ছাত্র দিবস’ ঘোষণা করেছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক দিবসের তালিকায় ১৫ অক্টোবর রয়েছে ‘আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস’। ফলে আবদুল কালামের জন্মদিনে বিশ্ব ছাত্র দিবস পালনের প্রচলন থাকলেও একে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক দিবস বলা সঠিক নয়।
১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রামেশ্বরমে জন্মগ্রহণ করেন আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আবদুল কালাম। সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম পরিচিত বিজ্ঞানী।
তিনি পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডিআরডিওতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
ভারতের নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণযান এসএলভি-৩-এর উন্নয়ন এবং অগ্নি ও পৃথ্বী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তিনি ‘মিসাইলম্যান অব ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিতি পান। ১৯৮০ সালে এসএলভি-৩-এর মাধ্যমে রোহিণী উপগ্রহ কক্ষপথে স্থাপন ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। সূত্র: ভারতের রাষ্ট্রপতির সরকারি ওয়েবসাইট।
বিজ্ঞানী হিসেবে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের ২৫ জুলাই ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন কালাম। ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সহজ যোগাযোগ, সাদাসিধে জীবনযাপন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ আগ্রহ তাঁকে ‘জনগণের রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
রাষ্ট্রপতি হয়েও যিনি ছিলেন শিক্ষক
আবদুল কালামের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। তিনি বিশ্বাস করতেন, তরুণ প্রজন্মের কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা ও বৈজ্ঞানিক মনোভাব বিকশিত করতে পারলে একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া সম্ভব।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শেষ করার পরও তিনি শিক্ষকতা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়কে গুরুত্ব দেন। আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তরুণদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপায় নয়; বরং সমস্যা চিহ্নিত করা, প্রশ্ন তোলা, নতুন সমাধান খোঁজা এবং দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া।
‘উইংস অব ফায়ার’, ‘ইন্ডিয়া ২০২০’ এবং ‘ইগনাইটেড মাইন্ডস’-এর মতো বইয়ে তিনি তরুণদের স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস, বিজ্ঞানমনস্কতা ও জাতীয় উন্নয়নে অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর জীবনকাহিনি শিক্ষার্থীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হাজির করে—সীমিত সুযোগ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও অধ্যবসায় ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বড় লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা যায়।
দিবসটির তাৎপর্য কোথায়?
‘বিশ্ব ছাত্র দিবস’ নামে পরিচিত এই দিনটির তাৎপর্য শুধু একজন বিজ্ঞানীর জন্মদিন স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও দিনটি সামনে নিয়ে আসে।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বিস্তারের ফলে শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বাইরে গিয়ে বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগদক্ষতা ও নৈতিকতার চর্চা তাই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তি ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগের পার্থক্য, গবেষণার সীমিত পরিবেশ এবং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের বাধা দূর করা জরুরি। আবদুল কালামের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার অর্থ কেবল তাঁর ছবি প্রকাশ বা বাণী উদ্ধৃত করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের জন্য এমন পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে তারা প্রশ্ন করতে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে এবং ব্যর্থতা থেকে শিখতে পারে।
জাতিসংঘের স্বীকৃতি নয়, আদর্শই বড়
২০১৫ সালের ২৭ জুলাই ভারতের শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আবদুল কালাম। মৃত্যুর আগমুহূর্তেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকা তাঁর শিক্ষকসত্তার প্রতীক হয়ে আছে।
তাঁর জন্মদিনকে ‘বিশ্ব ছাত্র দিবস’ বলা হয় কি না, কিংবা দিবসটির জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আছে কি না—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর দেখানো আদর্শ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে। স্বপ্ন দেখা, জ্ঞান অর্জন, বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া এবং নিজের কাজের মাধ্যমে সমাজের উপকার করার যে আহ্বান তিনি রেখে গেছেন, সেটিই তাঁর উত্তরাধিকারের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ।
আবদুল কালামকে স্মরণ করার যথার্থ উপায় তাই শুধু একটি দিবস পালন নয়; বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামনে শেখার সুযোগ, চিন্তার স্বাধীনতা এবং নিজের সামর্থ্য বিকাশের পথ খুলে দেওয়া।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দিবসের তালিকা; মানিকন্ট্রোল, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, আকাশবাণী নিউজ, ভারতের রাষ্ট্রপতির সরকারি ওয়েবসাইট