ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ানো এবং দেশটির বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার অভিযোগ করে আসছেন মানবাধিকার কর্মী, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। মোদীর বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগগুলোর নেপথ্যে প্রধানত কয়েকটি ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতিক কারণ রয়েছে।
এসব কারণের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো:
১. নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন
২০২৪ সালে ভারত সরকার আইনটি কার্যকর করে। এতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ২০১৪ সালের আগে ভারতে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিষ্টানদের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে; মুসলিমদের এই তালিকায় রাখা হয়নি। সমালোচকদের মতে, ধর্মের ভিত্তিতে এই পার্থক্য বৈষম্যমূলক। সরকার অবশ্য আইনটিকে নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
২. মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য
রয়টার্সের ১৩ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণা সংস্থা ইন্ডিয়া হেট ল্যাব ২০২৫ সালে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ১ হাজার ৩১৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে; ২০২৪ সালের তুলনায় যা ১৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬৪টি ঘটনা বিজেপি-শাসিত বা বিজেপি-সমর্থিত জোটের শাসনাধীন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ঘটেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। বিজেপি এসব গবেষণাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করেছে এবং বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে।
৩. মুসলিমদের বাড়িঘর ভাঙা নিয়ে অভিযোগ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২৫-এ বলা হয়েছে, কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বা কথিত অপরাধের পর মুসলিমদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি এসব পদক্ষেপের কিছু ঘটনাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও বাড়িঘর ভাঙার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশনা দেয়।
৪. মুসলিমদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের ভারতবিষয়ক প্রতিবেদনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, হামলা এবং বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের কথিত অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এসব ঘটনা সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভারত সরকারের বক্তব্য ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যুক্তিও এই বিতর্কের অংশ।
মোদী ও বিজেপির বক্তব্য
মোদী ও বিজেপি বৈষম্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের বক্তব্য, সরকারি কল্যাণমূলক কর্মসূচি যেমন- খাদ্যসহায়তা, বিদ্যুৎ সংযোগ ও বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিকদের জন্য। বিজেপির সমর্থকেরা আরও বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপকে কেবল ধর্মীয় বিদ্বেষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যথেষ্ট গুরুতর ও আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত। এসব অভিযোগ নিয়ে স্বাধীন তদন্ত, আইনের সমান প্রয়োগ এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন রয়েছে।