ভারতের রাজস্থানে পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ড্রোনের মাধ্যমে ফেলা সন্দেহজনক প্যাকেট উদ্ধার করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, পিস্তল ও গুলি পেয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। মাদক পাচারের চালান সন্দেহে অভিযান চালানো হলেও প্যাকেটগুলোতে পাওয়া যায় ৭.৭৫ কেজি আরডিএক্সসহ বিস্ফোরক তৈরির বিভিন্ন উপকরণ। এ চালান দিয়ে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা। তবে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১২ ও ১৩ অক্টোবরের মধ্যবর্তী রাতে পাকিস্তানের ভেতর থেকে আসা তিনটি ড্রোন রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগর সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করে। ড্রোনগুলো রাওলা এলাকার ১২ কেডি গ্রামের কাছে একটি মাঠে কয়েকটি প্যাকেট ফেলে যায়। জায়গাটি ভারত-পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে।
প্যাকেটগুলো সংগ্রহ করতে রাতের অন্ধকারে মাঠে যান প্রায় ১৯ বছর বয়সী দুই তরুণ। আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নেওয়া রাজস্থান পুলিশের মাদকবিরোধী টাস্কফোর্সের (এএনটিএফ) সদস্যরা তাঁদের আটক করেন। পরে প্যাকেটগুলো তল্লাশি করে মাদকের পরিবর্তে বিস্ফোরক ও অস্ত্রের চালান পাওয়া যায়।
উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে ছিল আরডিএক্স, তাৎক্ষণিক বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত সরঞ্জাম (আইইডি), টাইমার, বিস্ফোরণ ঘটানোর সার্কিট, দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ সরঞ্জাম, ব্যাটারি, তুরস্কে তৈরি দুটি জিগানা পিস্তল এবং ৮৬৭টি গুলি।
এএনটিএফের মহাপরিদর্শক বিকাশ কুমার এনডিটিভিকে জানান, বোমাগুলো বিস্ফোরণের জন্য প্রয়োজনীয় সার্কিট সংযুক্ত করলেই সেগুলো কার্যকর করা সম্ভব ছিল। বিস্ফোরকের সঙ্গে ধাতব টুকরাও রাখা হয়েছিল, যা বিস্ফোরণের সময় ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারত। ঝুঁকি বিবেচনায় বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যদের ডেকে এনে বিস্ফোরকগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি প্যাকেটে মোট ৭ দশমিক ৭৫ কেজি আরডিএক্স ছিল। প্যাকেটগুলো বায়ুরোধী একাধিক স্তরে মোড়ানো হয়েছিল। ড্রোন থেকে ফেলার সময় আঘাত কমাতে প্যাকেটের চারপাশে নলও ব্যবহার করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর ধারণা, তল্লাশি এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এভাবে বিস্ফোরকগুলো প্যাকেটজাত করা হয়েছিল।
আটক দুই তরুণের নাম লাখবিন্দর ও সুখবিন্দর। তাঁদের একজন পাঞ্জাবের ফিরোজপুর এবং অন্যজন জলন্ধরের বাসিন্দা; তাঁরা সম্পর্কে চাচাতো ভাই। তদন্তকারীদের দাবি, গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে পাঞ্জাবের ফাজিলকা জেলার জলালাবাদ থানায় গ্রেনেড হামলার ঘটনায়ও তাঁদের খোঁজা হচ্ছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরএস নামে পরিচিত এক আত্মীয়ের নির্দেশে তাঁরা সীমান্তের ওপার থেকে আসা চালানটি সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা রাওলার ১২ কেডি গ্রামের কাছে একটি খামারে কাজ করছিলেন। কৃষিশ্রমিকের পরিচয়ে সেখানে অবস্থান করে তাঁরা সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের চলাচলের ওপর নজর রাখছিলেন বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চালানটি কোথায় পাঠানোর কথা ছিল, তা আটক দুই তরুণের জানা নাও থাকতে পারে। তাঁদের মূল দায়িত্ব ছিল কেবল প্যাকেট সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া। তবে প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য তাঁদের আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আটক ব্যক্তিরা আরও জানিয়েছেন, সীমান্তের ওপারে থাকা উমর চাচা, ডুঙ্গার চাচা ও শাহ পাঠান নামে তিন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কনফারেন্স কলের মাধ্যমে এই যোগাযোগ হতো বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে পাঞ্জাবে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা আরএসের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
বিস্ফোরক ও অস্ত্রের চালানটি রাজস্থানেই কোনো হামলার জন্য আনা হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো রাজ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। উৎসবের মৌসুম কিংবা পাঞ্জাবের নির্বাচন সামনে রেখে হামলার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার তদন্তে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) এবং রাজস্থান পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট যুক্ত হয়েছে। কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (ইউএপিএ), অস্ত্র আইন ও বিস্ফোরক পদার্থ আইনে মামলা করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও বিস্ফোরকের উৎস, সম্ভাব্য গন্তব্য এবং এর সঙ্গে জড়িত বৃহত্তর নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত চলছে।
সূত্র: এনডিটিভি