১২ বছর পর চীন-উত্তর কোরিয়া সংযোগকারী সেতু চালু

দীর্ঘ ১২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সংযুক্তকারী নতুন একটি সেতু চালু হয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ইয়ালু নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি খুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চীন সীমান্তবর্তী দানদং শহর থেকে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজু পর্যন্ত স্থলপথে যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে এই সেতু।

ইয়ালু নদীর ওপর নির্মিত ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ। চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংকে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুর সঙ্গে যুক্ত করেছে এটি। সেতুটি চালুর ফলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে এটি চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান স্থলপথ হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এক ভিডিও বার্তায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বলেন, নতুন সেতুটি চীন ও উত্তর কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্বের একটি নতুন প্রতীক। তাঁর ভাষায়, এর মাধ্যমে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। সেতুটি চালুর মধ্য দিয়ে কেবল যোগাযোগের অবকাঠামোই বাড়ছে না, বরং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ারও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বুধবার বলেন, নতুন সেতুটি দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। তাঁর মতে, এর ফলে বাণিজ্য এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান আরও সহজ হবে।

সেতুটি নির্মাণের কাজ শেষ হলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালে সেতুটি চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কে অবনতি ঘটার পর উত্তর কোরিয়ার অংশে অবকাঠামো নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সেতুটি চালুর উদ্যোগ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকে। প্রায় এক যুগ পর সেই অচলাবস্থা কাটিয়ে সেতুটি চালু হলো।

নতুন সেতুটি কয়েক দশক পুরোনো চীন-কোরিয়া মৈত্রী সেতুর বিকল্প হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পুরোনো সেতুটি ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে নির্মাণ করেছিল জাপান। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে স্থলপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নতুন সেতু চালুর ফলে পণ্য পরিবহন ও সীমান্তবর্তী যোগাযোগের জন্য অতিরিক্ত অবকাঠামো পাওয়া গেল।

চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটির ওপর পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির জন্য চীনের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিসর বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন সেতুটি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে এই যোগাযোগ চালু হলেই যে বাণিজ্য দ্রুত বেড়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

গত বছর চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৭০ কোটি ডলার। এই বাণিজ্যের বড় অংশই ছিল চীন থেকে উত্তর কোরিয়ায় পণ্য রপ্তানি। নতুন সেতু চালু হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়লেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে থাকতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের চীনা অধ্যয়নবিষয়ক অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং মনে করেন, জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় সীমান্ত বাণিজ্যে হঠাৎ বড় ধরনের উল্লম্ফনের সম্ভাবনা কম। তাঁর মতে, উত্তর কোরিয়াও চীনা পণ্যের ব্যাপক আমদানির বিষয়ে সতর্ক। কারণ, এতে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনের প্রভাব অনেক বেড়ে যেতে পারে। বেইজিংও পিয়ংইয়ংয়ের এই উদ্বেগ সম্পর্কে অবগত। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ধীরে ধীরে বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

চীন ও উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিনের মিত্র। দেশ দুটির মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও রয়েছে। চীনের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি থাকা একমাত্র দেশ উত্তর কোরিয়া। তবে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা গেছে।

বিশেষ করে ২০১০-এর দশকের বড় একটি সময়জুড়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে চীনের উদ্বেগ ছিল। ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের নেতৃত্বে দেশটি একটি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এরপর নিষিদ্ধ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও বাড়তে থাকে। এসব ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সামরিক সহযোগিতা জোরদার হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চীনের প্রকাশ্য অবস্থানে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এডওয়ার্ড হাওয়েল বলেন, এক দশক আগেও বেইজিং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিকীকরণের কঠোর সমালোচনা করত এবং পিয়ংইয়ংকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানাত। কিন্তু এখন এ বিষয়ে চীনের বক্তব্য অনেকটাই কমে গেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সেতুটি চালু হওয়াকে শুধু দুই দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই উদ্যোগ দুই দেশের বাণিজ্য কতটা বাড়াবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিবেচনা এবং বেইজিং-পিয়ংইয়ং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর। সূত্র: বিবিসি