মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত এবং সৌদি আরবে হুতিদের হামলা আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ, লোহিত সাগর ও কৃষ্ণসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং খাদ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন কিংবা দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ অনিবার্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর শুধু সামরিক শক্তির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, বিমান চলাচল, পর্যটন, বিনিয়োগ ও খাদ্যবাজারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ এবং সৌদি আরবে হুতিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি নতুন করে চাপে পড়েছে। কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পর্যটন, বিমান চলাচল ও বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় ২০২৭ সালে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একযোগে বিঘ্ন ঘটলে খাদ্য সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে আমদানিনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর ওপর।

যুদ্ধ কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে?

বর্তমান সংঘাতে একাধিক রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর লড়াই নতুন করে তীব্র হয়েছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

রয়টার্সের ১৫ অক্টোবরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে বোমা হামলা শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ৮৪টি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোস্থলে অন্তত ১৩৫টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শনাক্ত করেছে সংস্থাটি। এসব হামলায় জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর, পাইপলাইন ও অন্যান্য কৌশলগত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ ধরনের হামলা যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন দেশকে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। কোনো দেশের সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো কিংবা বাণিজ্যিক নৌযানে হামলার জবাবে পাল্টা আক্রমণ হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

তবে আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তৃত হওয়া আর বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া এক বিষয় নয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা মূল্যায়নে দেখতে হবে, বড় শক্তিগুলো সরাসরি পরস্পরের বিরুদ্ধে কতটা সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ছে, নতুন রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে কি না এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কার্যকর থাকছে কি না।

এ মুহূর্তে সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে—এমন পূর্বাভাসকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর একটি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ৩০ মার্চের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ৯৫ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল। এতে জ্বালানি ও সার সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং পরিবহন, বিমা ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।

এর প্রভাব একাধিক ধাপে বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে বা পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষিযন্ত্র চালানো, সেচ, পণ্য পরিবহন এবং শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সার উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়ে।

সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের বাজারে পৌঁছাতে পারে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও চাল, গম, ভোজ্যতেল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

খাদ্যের দাম বাড়ার সংকেত দিচ্ছে এফএও

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক আগস্টের তুলনায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে সূচকটি বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

এফএওর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। গমের আন্তর্জাতিক দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভুট্টার দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে পরিবহন ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং আবহাওয়াজনিত উদ্বেগের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তাও বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে।

তবে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির সব কারণই যুদ্ধ নয়। আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতি, উৎপাদনের পূর্বাভাস, রপ্তানি সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক চাহিদাও দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এফএওর তথ্য বলছে, একাধিক সংকট একসঙ্গে কাজ করায় বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি কোথায় বেশি?

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ৮ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ, লোহিত সাগর ও কৃষ্ণসাগরের নৌপথে একই সময়ে বিঘ্ন ঘটলে খাদ্য, জ্বালানি ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।

সংস্থাটি সতর্ক করেছে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে একযোগে সংকট তৈরি হলে আরও কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। জ্বালানির মূল্য বাড়লে কৃষিকাজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। ফলে খাদ্যের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইয়েমেনের পরিস্থিতি এর একটি বাস্তব উদাহরণ। ডব্লিউএফপির ১৪ অক্টোবরের সতর্কতা অনুযায়ী, দেশটির তায়েজ শহর ও আশপাশের এলাকায় সংঘাতের কারণে প্রায় আট লাখ মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শহরটিতে গমের আটার মজুত প্রায় শেষ হয়ে আসছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাজারের অবশিষ্ট খাদ্যও দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা কেবল ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক পরিস্থিতি নয়; যুদ্ধ, অবরোধ ও সহায়তা সরবরাহে বাধার কারণে কিছু অঞ্চলে ইতিমধ্যেই তীব্র খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশ্বের সব অঞ্চল একই মাত্রার দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে।

দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের ঝুঁকি কতটা?

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়তে পারে। সার আমদানি ব্যয়বহুল হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা পরবর্তী সময়ে খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সারবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা উদ্বেগের বিষয়। আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে খাদ্যসংকট বা দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেশের নিজস্ব খাদ্য উৎপাদন, সরকারি মজুত, আমদানির সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়া মানেই কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়া নয়। খাদ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও মানুষের আয় কমে গেলে বা বাজারে খাবারের দাম নাগালের বাইরে চলে গেলে খাদ্যনিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে। আবার সংঘাতের কারণে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে খাদ্যের প্রাপ্যতাও কমে যেতে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে সংঘাত কত দিন স্থায়ী হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও সারের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং খাদ্য আমদানির খরচ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হলে এবং সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা কমার সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা থেকে স্পষ্ট, যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী কিংবা পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্ভিক্ষ আসন্ন—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো তথ্য নেই।

সবচেয়ে বাস্তবসম্মত আশঙ্কা হলো, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে যুদ্ধের সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও খাদ্য, জ্বালানি ও সারের দাম বাড়বে; দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো আরও চাপে পড়বে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা আরও নাজুক হয়ে উঠবে। তাই বিশ্বযুদ্ধের নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে সংঘাত প্রশমন, বাণিজ্যপথ সচল রাখা এবং খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষিত করাই এখন বেশি জরুরি।