ফিফা কাউন্সিলে ক্ষমা চেয়েও রেহাই পেলেন না ইনফান্তিনো

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তাঁর প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নিয়ে ফিফা কাউন্সিলের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তবে ফিফার সহ-সভাপতি ও ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) চেয়ারম্যান ডেবি হিউইট বলেছেন, সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর জবাব না দিলে ইনফান্তিনোকে ফিফা সভাপতি হিসেবে যোগ্য মনে করা কঠিন।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা কাউন্সিলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামে ইনফান্তিনোর একটি গোপন প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার পর এটিই ছিল কাউন্সিলের প্রথম বৈঠক। প্রস্তাবটি সামনে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই তা বাতিল করা হয়।

এফএফই প্রস্তাবের আওতায় ফিফার বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠকে এফএফই ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত, ফিফা শান্তি পুরস্কার এবং সদস্য দেশগুলোর ফুটবল সংস্থাকে অর্থায়নের বিষয়েও ইনফান্তিনোকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।

বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর ফিফার প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় ইনফান্তিনো বলেন, এফএফই প্রকল্প নিয়ে যোগাযোগ ও পরামর্শের প্রক্রিয়ায় যে ভুল হয়েছে, তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁর দাবি, এটি ছিল কেবল একটি প্রস্তাব, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বিদ্যমান তহবিলের সহায়তা বন্ধ না করে সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

ইনফান্তিনো আরও জানান, বৈঠকে বিভিন্ন মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর লিখিত উত্তর যথাসময়ে দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। তবে বৈঠকের পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি তিনি। বিবিসিসহ সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও জবাব দেননি।

ডেবি হিউইটের ভাষ্য, বৈঠকটি ছিল তাঁর অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে খোলামেলা, স্পষ্ট ও কঠোর আলোচনাগুলোর একটি। কিন্তু বৈঠকের আগে চাওয়া এফএফই-সংক্রান্ত নথিপত্রসহ নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এসব প্রশ্ন লিখিতভাবে জমা দিতে বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

হিউইট বলেন, ইনফান্তিনোকে এখন এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তা না হলে ফিফার সভাপতি হিসেবে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। তাঁর মতে, এফএফই প্রস্তাবের পেছনের যুক্তি, বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘটনা এবং শান্তি পুরস্কার দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা দীর্ঘদিন ধরেই ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের সমালোচনা করে আসছে এবং তাঁকে পদ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। এফএফই-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি আদালতে আবেদনও করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও জানিয়েছে উয়েফা।

হিউইট আশা প্রকাশ করেন, ইনফান্তিনো স্বেচ্ছায় সংশ্লিষ্ট নথিগুলো কাউন্সিলের কাছে প্রকাশ করবেন। এতে প্রস্তাবটি কীভাবে তৈরি ও এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তা বোঝা সহজ হবে এবং কোনো আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

আগামী মার্চে তৃতীয়বারের মতো ফিফা সভাপতি পদে নির্বাচনে লড়বেন ইনফান্তিনো। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রার্থী সামনে আসেননি। টটেনহ্যাম ও সুইজারল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার রামন ভেগা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় পাঁচটি সমর্থনপত্র পাওয়া থেকে শুরু করে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

ইউরোপীয় ফুটবলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসি স্পোর্টকে জানিয়েছেন, তাঁরা আর্সেনালের সাবেক কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। তবে ফিফার বৈশ্বিক ফুটবল উন্নয়ন বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে নিজের ঊর্ধ্বতন ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়তে তিনি রাজি হবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

নির্বাচনে প্রার্থিতা জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৮ নভেম্বর। হিউইটের মতে, ফিফার ২১১টি সদস্য সংস্থার ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে ইনফান্তিনোর বিপরীতে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এবার ভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকলে ফিফার সদস্য সংস্থাগুলো নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে বলে মনে করেন হিউইট। তাঁর মতে, নতুন সভাপতিকে ফুটবলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কারের সাহস দেখাতে হবে।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখার পর তাঁর এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানোর পর এ ঘটনা ঘটে।

বিবিসি স্পোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে ফিফার শৃঙ্খলাবিধি সংশোধনের একটি প্রস্তাব কাউন্সিলে তোলা হয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে শৃঙ্খলা কমিটি লাল কার্ডের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরোপিত এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করতে পারবে না। ফিফার আইনবিষয়ক কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে ডিসেম্বরে কাউন্সিলকে জানাবে।

হিউইট বলেন, বালোগুনের ঘটনা ও এফএফই প্রস্তাবসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি বিষয় ফুটবলের ভাবমূর্তিকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। মাঠের বাইরের আচরণ যখন মাঠের খেলার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন তা ফুটবলের জন্য উদ্বেগজনক।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা শান্তি পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টিও বৈঠকে আলোচিত হয়। কীভাবে এই পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কারা এতে ভূমিকা রেখেছেন এবং পুরস্কারটি বাতিল করা বা এর কাঠামো সংস্কার করা প্রয়োজন কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে ফিফার সামাজিকবিষয়ক কমিটি। আগামী ডিসেম্বরে কমিটিটি কাউন্সিলের কাছে প্রতিবেদন দেবে। এরপর সুপারিশের ভিত্তিতে কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেবে।

হিউইটের মতে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অতীতে কী ঘটেছে, তা আগে পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি। ফিফার নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং ফুটবলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রশ্নে চলমান বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে এই বৈঠক।

সূত্র: বিবিসি

ওয়াইএ
আরও পড়ুন