যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না ইরান। ওয়াশিংটন চুক্তি করার পরও শর্ত পরিবর্তন করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে দেশটি তার পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে রাজি হবে না। যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর জন্য যেকোনো টেকসই চুক্তিতে দুই পক্ষের ছাড় এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো প্রত্যাহার করা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এ মত তুলে ধরা হয়েছে। নিবন্ধটির লেখকের মতে, ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের ছাড় দিতে বলছে যুক্তরাষ্ট্র; কিন্তু বিনিময়ে দেওয়া অর্থনৈতিক সুবিধা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ওয়াশিংটন একতরফাভাবে প্রত্যাহার করতে পারলে কোনো চুক্তিই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। নিবন্ধে বলা হয়েছে, গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে ইরানের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
লেখকের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতার পথে বড় বাধা হলো চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত পরিবর্তনের প্রবণতা। উদাহরণ হিসেবে নিবন্ধে জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার কথা বলা হয়েছে। ওই সমঝোতায় ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত প্রাপকদের জন্য আটকে রাখা অর্থ ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পাঁচ দিন পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভিন্ন ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন। সে অনুযায়ী, অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং অর্থ ব্যয় সীমিত থাকবে মার্কিন সয়াবিন, ভুট্টা ও গম কেনার মধ্যে।
লেখকের যুক্তি, এতে ইরানের নিজস্ব অর্থ ব্যবহারের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়। ফলে ইরান যে সুবিধার আশায় পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেবে, সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়। নিবন্ধে বলা হয়েছে, জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরানের তেল বিক্রিতে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি যুক্ত ছিল। এর বিনিময়ে ইরানের কাছ থেকে সংঘাত বন্ধ রাখা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হয়েছিল। সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনার কথাও উল্লেখ করা হয়।
লেখকের দাবি, ইরান প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সহযোগিতা করতে রাজি হলেও সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনায় নিজের ভূমিকা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে সম্মত হয়নি। কিন্তু এর এক দিন পর যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি সামুদ্রিক কেন্দ্র ওমানের জলসীমা দিয়ে দক্ষিণের একটি বিকল্প পথ ব্যবহারের সুপারিশ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উত্তরের নৌপথ এড়িয়ে চলা। নিবন্ধ অনুযায়ী, ২৫ জুন সমন্বয়হীন বিকল্প পথ ব্যবহার করা একটি জাহাজে ইরানি বাহিনী গুলি চালানোর পর সমঝোতার সহযোগিতামূলক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। লেখকের ব্যাখ্যা, ওয়াশিংটন একদিকে হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে ইরানের সহযোগিতা চাইছিল, অন্যদিকে প্রণালির ওপর তেহরানের কৌশলগত প্রভাব কমানোর পথও খুঁজছিল। ফলে সমঝোতার লক্ষ্য ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক সুবিধার প্রতিশ্রুতিও অনিশ্চিত
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, জুনের শেষ দিকে কাতার নিশ্চিত করেছিল যে ইরানের আটকে রাখা অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া তখনো চূড়ান্ত হয়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ওই অর্থ দিয়ে মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার সীমাবদ্ধতা ছিল বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। এরপর জুলাইয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় তেল বিক্রির অনুমোদন প্রত্যাহার করে নেয়। নিবন্ধের দাবি, অনুমোদন দেওয়ার মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। লেখকের মতে, একই প্রশাসন অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার করতে পারলে ভবিষ্যতের চুক্তিতেও ইরানের জন্য ঝুঁকি থেকে যায়। তাই শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল ছাড়কে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির অভিজ্ঞতা
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তির ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির অভিজ্ঞতাকেও নিবন্ধে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমায়, কিছু সেন্ট্রিফিউজ খুলে ফেলে এবং আরাকের ভারী পানির চুল্লির মূল অংশ অকার্যকর করে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ ইরানের চুক্তি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। এরপর ইরান এক বছরের বেশি সময় অপেক্ষা করে চুক্তির কিছু বাধ্যবাধকতা থেকে সরে আসতে শুরু করে।
নিবন্ধটির যুক্তি, পরমাণু উপকরণের মজুত, সেন্ট্রিফিউজ ও স্থাপনার পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পরিদর্শকেরা যাচাই করতে পারেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে কি-না, তা একইভাবে যাচাই করা যায় না। নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করতে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই যথেষ্ট হতে পারে, অথচ পরমাণু স্থাপনা পুনর্গঠন করতে বছরের পর বছর লাগতে পারে।
পারমাণবিক সক্ষমতা কেন ইরানের কাছে নিরাপত্তার প্রশ্ন?
নিবন্ধে ‘নিউক্লিয়ার ল্যাটেন্সি’ বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পৌঁছানোর সক্ষমতাকে ইরানের জন্য কৌশলগত সুরক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, দেশটির হাতে এমন প্রযুক্তিগত ও শিল্প সক্ষমতা থাকা, যার সাহায্যে প্রয়োজন হলে তুলনামূলক দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোনো সম্ভব হতে পারে, যদিও বাস্তবে অস্ত্র তৈরি করা হয়নি। লেখকের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে যুদ্ধ তেহরানের কাছে পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলগত গুরুত্বও বাড়িয়েছে।
নিবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ইরান যদি মনে করে পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়ার পরও ভবিষ্যতে আবার হামলার ঝুঁকি থাকবে, তাহলে সেই ছাড়কে দেশটি নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক মনে করতে পারে। এ অবস্থায় সামরিক চাপ দিয়ে পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ত্যাগ করানোর চেষ্টা উল্টো পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের প্রণোদনা বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি নিবন্ধকারের বিশ্লেষণ। পারমাণবিক সক্ষমতা ইরানের নিরাপত্তা হিসাবকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই