‘সুদানের বারায় আর কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই’

সুদানের উত্তর কর্দোফান রাজ্যের বারায় যেন নেমে এসেছে মৃত্যুর উপত্যকা। শহরের রাস্তায়, চত্বরে, পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতরে এবং আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে ছিল শত শত মরদেহ। কোথাও পড়ে ছিল পচে যাওয়া দেহ, কোথাও পড়ে ছিল কঙ্কাল। সেই মরদেহগুলো সংগ্রহ করে দাফন করতে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা। প্রায় ৫০ জনের একটি দল ইতোমধ্যে ৬০০টিরও বেশি মরদেহ সংগ্রহ ও দাফন করেছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই (এমইই)।

প্রতিবেদনটিতে স্থানীয় কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, শহর ও আশপাশের এলাকায় এখনো শত শত মরদেহ পড়ে থাকতে পারে। ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও স্বেচ্ছাসেবকেরা সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মরদেহ সংগ্রহ, দাফন এবং এলাকা পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এক স্বেচ্ছাসেবকের কথায়, “বারায় এখন আর কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই।” তাঁর এই বক্তব্য শহরটির ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে।

এমইইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) বিরুদ্ধে বারায় গণহত্যা ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, নিহতদের অধিকাংশই বেসামরিক মানুষ। বাকিদের মধ্যে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) এবং আরএসএফের যোদ্ধারাও রয়েছেন। তবে নিহতদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও মোট সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি বলে প্রতিবেদনের তথ্য থেকে বোঝা যায়।

বারা প্রতিরোধ কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আবদুল রহমান জানান, শহরের রাস্তা, চত্বর ও বাড়িঘরের ভেতর থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আশপাশের গ্রামগুলোতেও মরদেহ পড়ে রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গেরাইগিখ, জাবরাত আল-শেখ ও উম সায়ালাসহ কয়েকটি এলাকায় এখনো মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধার করা মরদেহের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এক স্বেচ্ছাসেবক এমইইকে জানান, তাঁরা এলাকায় প্রায় ২০০টি গণকবর খুলে সেগুলোর ভেতরে থাকা মরদেহগুলো যথাযথভাবে পুনরায় দাফন করেছেন। এর বাইরে আরও প্রায় ৪০০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অর্থ জোগাড় করা হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বারার নারী-পুরুষ এবং বিদেশে বসবাসরত সুদানি প্রবাসীদের সহায়তায়। উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা প্রবাসীরাও অর্থ ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়েছেন বলে জানান ওই স্বেচ্ছাসেবক।

সুদানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সুদানিজ রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবকদের মরদেহ রাখার ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম দিয়েছে। তবে তাঁদের অভিযোগ, পুরো কার্যক্রম চালানোর মতো পর্যাপ্ত সহায়তা এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, মরদেহ সংগ্রহ ও দাফনের কাজ চালিয়ে যেতে তাঁদের জ্বালানি, গ্লাভস, মুখোশ, জীবাণুনাশক, মরদেহ রাখার ব্যাগ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় অনেক মরদেহ পচে গেছে। কিছু মরদেহ কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। সুদানের মতো উষ্ণ আবহাওয়ায় দেহের পচন দ্রুত ঘটে; ফলে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

স্বেচ্ছাসেবকেরা গ্লাভস, সুরক্ষামূলক পোশাক ও মুখোশ পরে মরদেহ সংগ্রহ করছেন। পুরোনো গাড়ি ও পিকআপে করে সেগুলো নির্ধারিত স্থানে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পোকামাকড়, বিচ্ছু এবং মৃত প্রাণীর দেহ ছড়িয়ে থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন মরদেহ পড়ে থাকা ও পরিচ্ছন্নতার অভাবে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। অজ্ঞাত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে তাঁদের দাবি থাকলেও, নির্দিষ্ট কোনো রোগ শনাক্ত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

এ পরিস্থিতিতে মরদেহের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ পানি, পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

সুদানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, বারার আশপাশে ১০০টিরও বেশি গ্রামে আরএসএফের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। হামলার কারণে এসব এলাকার বাসিন্দাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছে।

বারার স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী খালিদ ইসমাইল আহমেদ আলি আল-আইসিরের বৈঠকের পর মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরএসএফের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা ও পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে মরদেহ সংগ্রহ ও দাফনের প্রধান দায়িত্ব এখনো স্থানীয় মানুষের ওপরই বর্তেছে। তাঁদের কাজের পরিধি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি বিবেচনায় আরও সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।

সুদানে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। এরপর থেকে দেশটি ভয়াবহ মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। এমইইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং নিহতের সংখ্যা অন্তত দেড় লাখ বলে ধারণা করা হয়।

সংঘাতের দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিম সুদানের দারফুর অঞ্চলে আরএসএফের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও রয়েছে। তবে বিভিন্ন ঘটনায় দায়, নিহতের সংখ্যা ও অপরাধের ধরন নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।

আরএসএফকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থন করছে বলে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। আবুধাবি অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। সুদানের সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও কূটনৈতিক পর্যায়েও এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী তুরস্ক ও মিসরের সামরিক সমর্থন পেয়ে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতা যুদ্ধের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানকে আরও জটিল করে তুলেছে।

উত্তর কর্দোফানে সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের সেনাবাহিনীর অগ্রগতির কথাও জানিয়েছে এমইই। সেনাবাহিনী সোডার, উম বাদির ও আল-মাজরুবসহ কয়েকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে আরএসএফ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এল-ওবেইদ, হোয়াইট নাইল রাজ্যের কোস্তি, উত্তরাঞ্চলের আতবারা এবং রাজধানী খার্তুম ও ওমদুরমানও এসব হামলার আওতায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

উত্তর কর্দোফান ও পশ্চিম কর্দোফানের কিছু অঞ্চল গাম আরবিক উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রাকৃতিক উপাদান খাদ্য, পানীয়, ওষুধ ও প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহৃত হয়। যুদ্ধের কারণে এসব অঞ্চলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে।

বারার ঘটনা শুধু নিহত মানুষের সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি এমন এক মানবিক বিপর্যয়ের ছবি, যেখানে স্বজন হারানো পরিবার, বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবকেরা একই সংকটের মুখোমুখি।

মরদেহ সংগ্রহ ও সম্মানজনক দাফন নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন জীবিত মানুষের জন্য চিকিৎসা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় এবং নিরাপদে বাড়ি ফেরার পরিবেশ তৈরি করা।

প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং মানবিক সহায়তার নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না হলে বারার মতো এলাকার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই