জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিশ্বের অগভীর পানির প্রায় সব প্রবালপ্রাচীর ধ্বংসের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর ব্যবস্থা বর্তমানে ‘চরম বিপন্ন’ পর্যায়ে রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির প্রথম বৈশ্বিক মূল্যায়নে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আইইউসিএনের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে প্রবালপ্রাচীরের ওপর তাপীয় চাপ তৈরি হচ্ছে এবং প্রবালের রং হারিয়ে ফেলার ঘটনা বা ‘কোরাল ব্লিচিং’ আরও ঘন ঘন ঘটছে। এসব কারণে প্রবালপ্রাচীরের অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
আইইউসিএনের প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র মূল্যায়ন দলের বৈজ্ঞানিক প্রধান মিশাল গুডকা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। এর ফলে প্রবালপ্রাচীরের মতো বাস্তুতন্ত্রের টিকে থাকার ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।
প্রাকৃতিকভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া এল নিনো পরিস্থিতিও প্রবালের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ বছর একটি শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান গুডকা। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭-এর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
কপ১৭ সম্মেলনে আইইউসিএন তাদের মূল্যায়নের ফলাফল তুলে ধরে। ২০৩০ সালের মধ্যে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বন্ধ ও তা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নেওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অগ্রগতি অর্জনের জন্য সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলোর ওপর চাপ রয়েছে।
প্রবালপ্রাচীরের ঝুঁকি মূল্যায়নে জাতিসংঘের জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের প্যানেলের মধ্যম পরিস্থিতির পূর্বাভাস ব্যবহার করেছে আইইউসিএন। এই পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে শিল্পায়ন-পূর্ব সময়ের তুলনায় বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। অন্যদিকে, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে দেশগুলোর বর্তমান অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলেও চলতি শতাব্দীতে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার পথে রয়েছে বিশ্ব—বুধবার জাতিসংঘের এক সতর্কবার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
আইইউসিএন বলেছে, বিশ্বজুড়ে প্রবালপ্রাচীর কমে যাওয়ার সবচেয়ে ধারাবাহিক ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপীয় চাপ। তবে অতিরিক্ত মাছ শিকারও প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতি বাড়াচ্ছে। কারণ, কিছু তৃণভোজী মাছ ও শিকারি প্রাণী সামুদ্রিক শৈবালের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। এসব মাছ অতিরিক্ত আহরণের ফলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বিশেষ করে প্যারটফিশ ও গ্রুপারজাতীয় মাছ অতিরিক্ত শিকারের কারণে বিশ্বের ৬৩ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দূষণ, পর্যটন এবং ঝড়ের তীব্রতা ও ঘনত্ব বেড়ে যাওয়াও প্রবালপ্রাচীরের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
আইইউসিএনের মূল্যায়নে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের ১২৭টি প্রবালপ্রাচীর ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হয়েছে। এগুলোর মোট আয়তন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬২ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ প্রবালপ্রাচীরগুলোর কয়েকটিও ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কোরাল ট্রায়াঙ্গল, ক্যারিবীয় অঞ্চলের মেসোআমেরিকান ব্যারিয়ার রিফ ব্যবস্থা এবং লোহিত সাগরের প্রবালপ্রাচীর।
কোনো প্রবালপ্রাচীরের জীবন্ত ভিত্তি তৈরি করা শক্ত প্রবাল ব্যাপকভাবে হারিয়ে গেলে এবং সেগুলোর জায়গায় শৈবাল, ভাঙা প্রবালের টুকরো ও স্পঞ্জজাতীয় জীবের আধিপত্য তৈরি হলে সেই বাস্তুতন্ত্রকে ধসে পড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত সপ্তাহে *নেচার* সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক প্রবাল প্রজাতি বিলুপ্তির তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। এ অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি গুরুতর হলেও বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলের প্রবালপ্রাচীর এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি বলে জানিয়েছে আইইউসিএন। সংস্থাটির হিসাবে, শুধু গত ৫০ বছরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতির পূর্বাভাস বাদ দিলে মাত্র ২৪ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রকে ‘চরম বিপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হতো। ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত করায় এ হার বেড়ে ৯৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
গুডকা বলেন, এই মূল্যায়ন প্রবালপ্রাচীর রক্ষায় দ্রুত ও ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়সীমার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে মানুষ যেসব পদক্ষেপ নেবে, তার ওপর নির্ভর করবে শতাব্দীর শেষ দিকে প্রবালপ্রাচীরগুলোর অবস্থা কেমন হবে। এগুলো বর্তমানের মতো টিকে থাকবে, নাকি ভিন্ন ধরনের বাস্তুতন্ত্রে রূপ নেবে—তা এখনকার সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে। এমন পরিবর্তন প্রকৃতি ও মানুষের জন্য এসব বাস্তুতন্ত্রের উপযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে।
আইইউসিএনের মহাপরিচালক গ্রেথেল আগুইলার বলেন, প্রবালপ্রাচীর পুনরুদ্ধারের সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এ জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো, প্রবালপ্রাচীর সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ জোরদার করা এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও এর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সূত্র: আরব নিউজ