সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও শহর লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের হামলার দাবির মধ্যে পাকিস্তান ও সৌদি আরব মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে, চুক্তির তৃতীয় অংশীদার তুরস্কও অনুমোদনের জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একই সময়ে ইসরায়েলের সামরিক মহড়ার খবর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান ২৩ অক্টোবর জানান, পাকিস্তান ও সৌদি আরব চুক্তিটির অনুমোদন সম্পন্ন করেছে। তুরস্কের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া তখনও চলছিল। ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত ডন-এর প্রতিবেদনেও এ তথ্য জানানো হয়।
গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নেতারা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। চুক্তির মূলনীতি হলো, তিন দেশের কোনো একটির ওপর বহিঃশত্রুর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তিতে সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক সক্ষমতা দ্রুত মোতায়েনের কাঠামো রয়েছে। তবে কোনো হামলার পর ঠিক কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিস্থিতি বিবেচনায় অংশীদার দেশগুলো যৌথভাবে নির্ধারণ করবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক এবং জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে করা হয়নি।
২৪ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা ইয়েমেনের হুতিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি তাইফ ও ইয়ানবুর দিকে ছোড়া হয়েছিল বলে জানানো হয়। এর আগে রিয়াদ, মক্কা, জেদ্দা ও তাইফের বাসিন্দাদের জন্য সতর্কতা জারি করা হলেও পরে বিপদ কেটে যাওয়ার কথা জানায় সৌদি সিভিল ডিফেন্স।
হুতিরা এর আগেও সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, আরামকোর স্থাপনা ও দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার দাবি করেছিল। তবে এসব দাবির সবকটি সৌদি কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেনি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, দাম্মামের বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষ দুজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ এবং সৌদি আরবকে কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হতে পারে, তা নিয়ে গুরুত্ব বেড়েছে। ৫ অক্টোবর রিয়াদে তিন দেশের কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠকে সম্মত সামরিক সক্ষমতা দ্রুত সৌদি আরবে মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে নির্দিষ্ট বাহিনী, সরঞ্জাম বা মোতায়েনের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
তুরস্ক ২০ অক্টোবর চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য সংসদে পাঠায়। তবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করা আর সেনা মোতায়েনের অনুমোদন এক বিষয় নয়। তুরস্কের ক্ষেত্রে বিদেশে সেনা পাঠাতে পৃথক সংসদীয় অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবকে সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা ও কারিগরি সহায়তা থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট মোতায়েনের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তুরস্কও জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা সহায়তার অর্থ হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া নয়।
শিরোনামে ইসরায়েলের সামরিক মহড়ার উল্লেখ থাকলেও মহড়ার তারিখ, স্থান, অংশগ্রহণকারী বাহিনী কিংবা উদ্দেশ্য সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। তাই মহড়াটিকে সৌদি আরবে হুতি হামলা বা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
তবে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংকট, ইয়েমেনের সংঘাত এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে ঘিরে বৃহত্তর উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কূটনৈতিক হিসাবকে জটিল করে তুলছে। ২৩ অক্টোবর ইস্তাম্বুলে ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানে হামলা না চালানোর আহ্বান জানান এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদন সম্পন্ন হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধ শুরু বা নির্দিষ্ট কোনো দেশে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নয়। বাস্তবে সহায়তার ধরন নির্ভর করবে হামলার প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর যৌথ মূল্যায়ন এবং তাদের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
সৌদি আরবে হামলা অব্যাহত থাকলে চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তুরস্কের অনুমোদনপ্রক্রিয়া, পাকিস্তানের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগ পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ডন।