যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত ইরান, হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না: বাঘাই 

যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের হুমকি ও সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে কূটনীতির পথও খোলা রাখতে চায় তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা রাখার মতো পরিস্থিতি নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের কথার সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ডের মিল পাওয়া যায় না।

রোববার (২৫ অক্টোবর) জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম এআরডিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বাঘাই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গে, যেখানে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না করার কথা বলা হয়েছে, বাঘাই বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কী বলছেন বা বলছেন না, তা ইরানের প্রস্তুতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। অতীতে কূটনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে। তাই সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা ছাড়া তেহরানের সামনে বিকল্প নেই।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি একসময় জানিয়েছিলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলার পরও ওয়াশিংটন ইরানে হামলার পথ বেছে নেয়।

বাঘাইয়ের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে সামান্যতম সদিচ্ছাও দেখায়নি। তেহরানের অভিজ্ঞতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

ইরান বিষয়ে ইউরোপের নীতির সমালোচনা করে বাঘাই বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করে চলার পরিবর্তে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল অবস্থান নিতে পারত। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে আরও পরিণত ভূমিকা প্রত্যাশা করে বিশ্ব।

তার অভিযোগ, ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার পরিবর্তে ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়া এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের উদ্যোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ইরানের পারমাণবিক চুক্তিটি জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত। এ চুক্তির ভবিষ্যৎ ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ এবং তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন বাঘাই। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে এই কৌশলগত জলপথ এবং পারস্য উপসাগরের অপর তীরে অবস্থিত কয়েকটি দেশের ভূখণ্ড ও সামরিক অবকাঠামো ব্যবহার করেছে।

বাঘাই বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইরান এই জলপথের নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে তেহরানকে এখন কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের সহযোগিতায় জাহাজগুলোকে ইরানের নির্ধারিত পথের পরিবর্তে অন্য পথে চলাচলের জন্য চাপ দিচ্ছে। এতে বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে বলে দাবি করেন তিনি।

বাঘাইয়ের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য দক্ষিণের নৌপথ ব্যবহার করছে। আগ্রাসনকারীরা যাতে এসব জলপথকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, সামরিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত এসব বক্তব্য ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া দাবি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

ইরান-জার্মানি সম্পর্কের প্রসঙ্গে বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা, নাকি ইরান বিষয়ে নিজেদের নীতিতে পরিবর্তন আনা—বার্লিনকে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি বলেন, একসময় ইরানে জার্মানদের সুনাম ছিল। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তৎকালীন ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনের কাছে রাসায়নিক উপাদান সরবরাহের বিষয়ে জার্মানির ভূমিকা নিয়ে ইরানের অসন্তোষ রয়েছে।

বাঘাইয়ের দাবি, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে জার্মানির সমর্থন এবং তেহরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ইরানের বক্তব্যে একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ খোলা রাখার বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনাস্থা এবং সামরিক প্রস্তুতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য পদক্ষেপ, ইউরোপের অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনগুলোতে আঞ্চলিক পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগও সংঘাত এড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।