ফের ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে তেলের দাম ছাড়াতে পারে ১৫০ ডলার

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ আবার শুরু হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের জ্বালানি কমিশনের চেয়ারম্যান হোজ্জাতোলেসলাম মুসা আহমাদি। তাঁর মতে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে, যার প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রসহ তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি (এমএনএ)।

আহমাদি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলার ছাড়িয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত কমে আসার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি সতর্ক করেন, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট মার্কিন অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ইরানের এই সংসদ সদস্যের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ-জ্বালানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্য ও সেবার দামও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে যেসব দেশ নিজেদের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের অর্থনীতিতে সংকটের প্রভাব বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়বে, আর সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের বহন করতে হতে পারে।

আহমাদি বলেন, জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দেশের ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আরও চাপের মুখে পড়তে হবে। সংকট যত দীর্ঘ হবে, তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি সামাল দেওয়াও তত কঠিন হয়ে উঠবে।

আহমাদির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, জ্বালানি বাজারে ইরানের কৌশলগত অবস্থান এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতাকে তেহরান গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। তাঁর দাবি, তেলের দাম দ্রুত কমে যাওয়ার সুযোগ সীমিত রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়বে।

তবে এটি ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতার বক্তব্য ও মূল্যায়ন। যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সরবরাহ, বৈশ্বিক চাহিদা এবং বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে তেলের প্রকৃত দাম নির্ধারিত হবে। ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারের পূর্বাভাসকে তাই নিশ্চিত মূল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ইউরোপের কয়েকটি দেশের জ্বালানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন আহমাদি। তাঁর বক্তব্যে ফ্রান্স, পর্তুগাল, আলবেনিয়া ও ইতালির নাম উঠে আসে।

তাঁর সতর্কবার্তা, তেল সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও চাপে পড়তে পারে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাজও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়তে পারে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের খরচ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।

তেলের দাম বাড়ার চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন ও শিল্পকারখানার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে বাংলাদেশের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কতটা বাড়ছে, কত দিন তা উচ্চপর্যায়ে থাকছে, সরকারের মূল্যনীতি এবং জ্বালানি আমদানির সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর।

সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে সংঘাত নতুন করে শুরু হলে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে। তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়াবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।