সেন্টমার্টিনে দিনে যেতে পারবেন সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক, ফি কতো?

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম

দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম। ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলবে পর্যটকদের যাতায়াত। এ সময়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। তবে প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। নতুন এই সিদ্ধান্তে পর্যটননির্ভর দ্বীপটির বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ ফির অর্থ ব্যয় ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।

গত রোববার (২৫ অক্টোবর) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় পর্যটকদের যাতায়াতের সময়সীমা, দৈনিক সংখ্যা ও ফি নির্ধারণের বিষয়টি জানানো হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়, পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াত ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দ্বীপটির পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত চালু থাকবে। অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজগুলো কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে চলাচল করবে। দ্বীপে পর্যটকদের চাপ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার জনের যাতায়াতের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায় করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০১৬-এর বিধি ২৬ অনুযায়ী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ ছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্টমার্টিনে নৌযান চলাচলের অনুমতি দিতে পারবে না বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর।

নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা আগের প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাগুলোও বহাল রাখা হয়েছে। ফলে পর্যটকদের যাতায়াতের নতুন সময়সীমা কার্যকর হলেও আগের পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত বিধিনিষেধও মানতে হবে।

পর্যটন মৌসুম ঘিরে আশায় দ্বীপবাসী

দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধে পর্যটননির্ভর মানুষের আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় সেন্টমার্টিনের অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছিল। নতুন মৌসুমে পর্যটকদের আগমন বাড়লে হোটেল-রিসোর্ট, নৌযান, খাবারের দোকানসহ স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে বলে আশা করছেন বাসিন্দারা।

সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ বলেন, পর্যটকদের যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। দ্বীপের বাসিন্দারা অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। পর্যটন মৌসুম চালু হওয়ায় তাঁরা খুশি। এতে পর্যটকেরা যেমন দ্বীপে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন, তেমনি স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারের পথও প্রসারিত হবে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দ্বীপের বাসিন্দারা আনন্দ মিছিল করেছেন বলেও জানান তিনি।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, গত দুই বছর পর্যটন ভ্রমণে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় দ্বীপের মানুষকে কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। তাঁদের জীবিকা মূলত পর্যটননির্ভর। নতুন মৌসুমে পর্যটকদের আগমন বাড়লে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ অনেকটা কমবে বলে আশা করছেন তিনি। এ সিদ্ধান্তের জন্য দ্বীপবাসীর পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান তিনি।

পরিবেশ সংরক্ষণ ফির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

সেন্টমার্টিনের প্রবাল, পাথুরে সৈকত, শামুক-ঝিনুক ও সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য দ্বীপটির অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু পর্যটকের চাপ বাড়লে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য, শব্দদূষণ এবং সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা ও পর্যটকদের অসচেতন আচরণ দ্বীপটির পরিবেশ রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে জনপ্রতি ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সেই অর্থের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। পরিবেশসচেতন ব্যক্তিদের মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তদারকি এবং বিধিনিষেধ কার্যকর করার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শুধু ফি আদায় করে দ্বীপটির পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন হবে।

টেকনাফ উপজেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ বাহা উদ্দিন বলেন, পর্যটকদের কাছ থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নেওয়া হলে সেই অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। এর মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণে কী সুফল আসবে, সে বিষয়েও স্বচ্ছ জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনের মানুষের খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত না করে শুধু পর্যটকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় যথেষ্ট যৌক্তিক নয়। তাঁর মতে, নিয়মিত তদারকি, পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পর্যটকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

টেকনাফ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সেক্রেটারি আবদুর রহমান নুরী বলেন, অতীতে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নেওয়ার নজির নেই বলে তাঁর জানা। তাই জনপ্রতি ১০০ টাকা করে আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেই অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। এ অর্থ যেন রাজনৈতিক দলের নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত