চতুর্থ মেয়াদে লুলার সামনে বিভক্ত ব্রাজিল সামলানোই বড় চ্যালেঞ্জ

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নজিরবিহীন চতুর্থ মেয়াদ শুরু করতে যাচ্ছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তবে নির্বাচনে জয় পেলেও সামনে কঠিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামলানোর চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে তার জন্য। বিভক্ত জনমত, বিরোধীদের শক্তিশালী অবস্থান, দুর্বল সরকারি অর্থব্যবস্থা, অপরাধ ও সহিংসতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ, সব মিলিয়ে নতুন মেয়াদে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারেন লুলা।

৮১তম জন্মদিনের কয়েক দিন আগে রোববারের (২৫ অক্টোবর) দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে জয়ী হন লুলা। তিনি পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। ভোটের এই ব্যবধান দেখিয়ে দিয়েছে, এক দশক ধরে ব্রাজিলের রাজনীতিকে বিভক্ত করে রাখা মেরুকরণ এখনো কাটেনি। অভ্যুত্থানচেষ্টার দায়ে ডানপন্থী নেতা জাইর বলসোনারোর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হলেও তার রাজনৈতিক ধারার প্রভাবও অটুট রয়েছে।

কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকাই বড় বাধা

লুলার সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে সরকার পরিচালনা ও আইন পাস করানো। বর্তমান মেয়াদেও কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না তার দলের। চলতি মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত আইনসভা নির্বাচনে বরং শক্তি বেড়েছে ডানপন্থীদের। জাইর বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ৫১৩ সদস্যের নিম্নকক্ষে ১২১টি এবং ৮১ সদস্যের সিনেটে ২৮টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।

এ পরিস্থিতিতে নিজের নীতি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে লুলাকে মধ্য-ডানপন্থী দলগুলোর জোট ‘সেন্ত্রাও’-এর ওপর নির্ভর করতে হবে। এই জোট সাধারণত ক্ষমতাসীনদের সমর্থন দেয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধার বিনিময়ে। তবে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করেন রিও ডি জেনেইরোর ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মায়রা গুলার্ত।

তার মতে, কেন্দ্রীয় বাজেটের ক্রমবর্ধমান অংশের ওপর আইনপ্রণেতাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। ফলে নির্বাহী বিভাগের ওপর তাঁদের নির্ভরতা কমছে এবং সরকারের পক্ষে সংসদে সমর্থন নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, নির্বাচনে জয়ী হয়েও নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়নে লুলাকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দর-কষাকষি করতে হতে পারে।

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা সরকারি ঘাটতি

লুলার নতুন মেয়াদে অর্থনৈতিক চাপও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। গেতুলিও ভার্গাস ফাউন্ডেশনের অর্থনীতিবিদ মাউরো রখলিনের ভাষায়, ব্রাজিলের তিনটি বড় সমস্যা হলো রাজস্বসংকট, বারবার একই সমস্যা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার যত অর্থ আয় করছে, ব্যয় হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে দেশটির সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিশ্বের অন্যতম উচ্চ সুদের হার বজায় রেখেছে। এই পরিস্থিতি দ্রুত অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন রখলিন। তার মতে, সরকারি অর্থব্যবস্থায় সমন্বয় আনা অনিবার্য হলেও তা সহজ হবে না। কারণ, ব্যয় কমানো বা রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অজনপ্রিয় হবে। পাশাপাশি কংগ্রেসে প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বিরোধিতাও মোকাবিলা করতে হবে সরকারকে।

এখানেই লুলার জন্য তৈরি হতে পারে বড় দ্বন্দ্ব। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দারিদ্র্য কমানো ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে লাখো মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে বলে দাবি করা হয়। নির্বাচনী প্রচারের সময়ও তিনি কল্যাণমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দিলে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ নিয়ে বিরোধীরাও তার সমালোচনা করেছে।

অপরাধ ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে বাড়তি চাপ

নির্বাচনী প্রচারে ব্রাজিলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল। দেশটির বিভিন্ন শহরে অপরাধী চক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব এবং সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন বহু মানুষ। বিরোধীরা লুলাকে অপরাধ দমনে অতিরিক্ত নমনীয় বলে সমালোচনা করেছে। নতুন মেয়াদে এসব অভিযোগের জবাব দিতে তাঁকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি দেখাতে হবে।

বিশেষ করে যেসব শহরে অপরাধী চক্র ও মিলিশিয়ারা বিভিন্ন এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে তাদের প্রভাব মোকাবিলা করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। নির্বাচনী প্রচারে লুলা গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের দায় নির্ধারণের ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করার প্রস্তাব সমর্থনের কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে, ডানপন্থীরা তা আরও কমিয়ে ১৪ বছর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপের দাবি এবং শিশু-কিশোরদের বিচারব্যবস্থার আওতায় আনার বয়স নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, দুই দিকই সামলাতে হবে লুলাকে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে গিয়ে মানবিক ও আইনি প্রশ্নের মুখেও পড়তে পারে তার সরকার।

ট্রাম্পের চাপ ও ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষা

লুলার নতুন মেয়াদে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানো। লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নির্বাচনী প্রচারে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তাই তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম পরীক্ষা হতে পারে।

গত বছর জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ব্রাজিলের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন। এরপর চলতি বছর কিছু পণ্যের ওপর আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। এতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন মেয়াদে লুলাকে একদিকে ব্রাজিলের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের অবস্থান ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও সামলাতে হবে।

এদিকে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি ডানপন্থী সরকার ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। এ প্রবণতাকে ‘অরেঞ্জ ওয়েভ’ বলা হচ্ছে, যা ট্রাম্পের গায়ের রঙের প্রতি ইঙ্গিত করে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও লুলার সামনে ভিন্নমুখী চাপ থাকবে।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক অলিভার স্টুয়েনকেলের মতে, রাজনৈতিক মতাদর্শ নেতাদের প্রতীকী সম্পর্ক ও বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব কূটনীতিতে এর প্রভাব সব সময় সমান হয় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই লুলাকে অপমানজনক মন্তব্য করলেও দুই দেশের সম্পর্কের মূল বিষয়গুলো খুব বেশি বদলায়নি বলে তার মূল্যায়ন।

সব মিলিয়ে, চতুর্থ মেয়াদে লুলার সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে সমঝোতা তৈরি, সরকারি অর্থব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর। নির্বাচনে জয় তাঁকে আরেকটি মেয়াদে ক্ষমতায় বসালেও ব্রাজিলের গভীর রাজনৈতিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার কাজটি সহজ হবে না। সূত্র: ডন