যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন মিশিগান থেকে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ। তাঁর দাবি, নিজের প্রশাসনের ব্যর্থতা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরাতেই তাঁকে লক্ষ্য করে এমন আক্রমণ চালাচ্ছেন ট্রাম্প।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) ডেট্রয়েটে এক সংবাদ সম্মেলনে এল-সাইয়েদ বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে তাঁকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর মতে, এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।
এল-সাইয়েদ বলেন, এসব আক্রমণ মূলত মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া এবং বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা। রিপাবলিকানদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে কথা বলছেন না।
তিনি আরও বলেন, মানুষের জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বিশুদ্ধ বাতাস ও পানির মতো বিষয়গুলো নিয়ে তাঁদের কোনো কার্যকর আলোচনা নেই। অথচ এসব সমস্যা সমাধান করাই সরকারের দায়িত্ব। তাঁর অভিযোগ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণেই এসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
এল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ বললেন ট্রাম্প
রোববার মিশিগানে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প এল-সাইয়েদকে নিয়ে একাধিক ভিত্তিহীন অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রে ‘শরিয়াহ আইন’ চালু করতে চান।
এল-সাইয়েদ সিনেটে গেলে তাঁকে প্রবেশের আগে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্যে এল-সাইয়েদকে কংগ্রেসের জন্য সম্ভাব্য শারীরিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরার ইঙ্গিত ছিল।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে হাস্যরসের মাধ্যমে উড়িয়ে দেন এল-সাইয়েদ। তিনি বলেন, ট্রাম্প জানেন, তাঁর কাছে ‘উলভারিনের নখ’ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া দলের পরিচিত নামের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলেন।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করতে পারে নির্বাচন
প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট নেতা এল-সাইয়েদ জনস্বাস্থ্য খাতের সাবেক কর্মকর্তা। মিশিগানে সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের সঙ্গে তাঁর হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। এই নির্বাচনের ফল আগামী দুই বছরের জন্য মার্কিন সিনেটে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রজার্স তাঁর নির্বাচনী প্রচারে এল-সাইয়েদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুড, হামাস ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার এল-সাইয়েদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ এ ধরনের আক্রমণ সমর্থন করেন না। তাঁর মতে, কিছু মানুষ দেশকে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আটকে রাখতে চান। কিন্তু মিশিগানের অধিকাংশ মানুষ উদার চিন্তা ও সহনশীলতায় বিশ্বাস করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো এমন মানুষেরা, যাঁরা দেশকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে চান এবং বিভ্রান্তি ও সংকীর্ণ মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। মিশিগানের মানুষ এসব আক্রমণের চেয়ে অনেক বড় মানসিকতার পরিচয় দেবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাম ও ধর্মকে রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার করার অভিযোগ
ট্রাম্প তাঁর নাম নিয়েও বিদ্রূপ করেছেন বলে অভিযোগ করেন এল-সাইয়েদ। তাঁর নামকে ভুলভাবে ‘মোহাম্মদ’ হিসেবে উপস্থাপন করার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
এল-সাইয়েদ বলেন, তাঁর নাম বা ধর্মের কারণে মানুষের জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাড়িভাড়া কিংবা বাড়ির ঋণের কিস্তি পরিশোধের সমস্যা তৈরি হয়নি। একইভাবে তাঁর নাম বা ধর্মের কারণে মানুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারছেন না—এমনও নয়।
তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগত পরিচয় ও ধর্মকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরির পরিবর্তে মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিশিগানের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দুই প্রার্থীর লড়াই নয়; এর ফল মার্কিন সিনেটের দলীয় ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় পরিচয়, অভিবাসী-সম্পর্কিত মনোভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয়—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা