পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধে ইরানের কট্টরপন্থীরা, নেপথ্যে কী?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৪ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা আরও জোরালো করছে দেশটির কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী পায়দারি ফ্রন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ রাখা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারেরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার দাবিও তুলেছে গোষ্ঠীটি।

ইসলামিক রেভল্যুশন স্ট্যাবিলিটি ফ্রন্ট নামে পরিচিত পায়দারি ফ্রন্ট ইরানের পার্লামেন্ট ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। গোষ্ঠীটির বক্তব্য, সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে ‘যত দ্রুত সম্ভব’। এ অবস্থানকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তেহরানের কট্টরপন্থীরা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগকে সামনে রেখে ওই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলায় ইরান এবং আরব বিশ্বের বিভিন্ন স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।

আলোচনা নাকি যুদ্ধ, ইরানে দুই শিবিরের দ্বন্দ্ব

গত আট মাসে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে মধ্যপন্থী ও কট্টরপন্থীদের মধ্যে ক্ষমতা ও নীতিগত অবস্থান নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থীরা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান চান। অন্যদিকে পায়দারি ফ্রন্টের কট্টরপন্থীরা মনে করেন, ওয়াশিংটন কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত।

মধ্যপন্থীদের লক্ষ্য দ্রুত সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে রক্ষা করা। অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা কূটনৈতিক উদ্যোগকে দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ইরানের বড় শহরগুলোর বিভিন্ন চত্বরে গত প্রায় ২০০ দিন ধরে কট্টরপন্থীদের সমর্থকেরা রাতে সমাবেশ করছেন। শুরুতে এসব জমায়েত ছিল সরকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রতিবাদ জানানোর কর্মসূচি। পরে সেগুলো সংগঠিত রাজনৈতিক সমাবেশে রূপ নেয়। সেখানে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার বিরোধিতা করা হচ্ছে।

সমাবেশে ‘আপস নয়, আত্মসমর্পণ নয়—আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই’ এবং ‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা মাতৃভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’—এ ধরনের স্লোগান দেওয়া হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষে পেজেশকিয়ান তেহরানে ফেরার পরও তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন কট্টরপন্থীরা। জাতিসংঘে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সমালোচনা করার পাশাপাশি কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। প্রেসিডেন্টের কাছে আলোচনাবিরোধী বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেই ওই বিক্ষোভকে দেখা হয়।

পার্লামেন্ট ও প্রশাসনেও কট্টরপন্থীদের প্রভাব

পায়দারি ফ্রন্টের প্রভাব শুধু রাস্তায় সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তেহরানের নগর প্রশাসন, পার্লামেন্ট, ধর্মীয় বক্তা ও শোকগাথা পাঠকদের বিভিন্ন মহল, শিক্ষাঙ্গন এবং গণমাধ্যমেও গোষ্ঠীটির শক্ত অবস্থান রয়েছে।

পায়দারি ফ্রন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পার্লামেন্ট সদস্য আমিরহোসেইন সাবেতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে না নেওয়া বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা উচিত নয়।

সাবেতির অভিযোগ, ইরানকে ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসেনি; বরং নতুন করে আকস্মিক হামলার উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করছে। তাঁর মতে, আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ ঠেকানো বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্ভব—এমন ধারণা বাস্তবতা সম্পর্কে ভুল বোঝাপড়ার শামিল। বিশ্ব কেবল শক্তির ভাষা বোঝে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে অভিশংসনের উদ্যোগ নিয়েছে পায়দারি ফ্রন্ট-ঘনিষ্ঠ অংশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরের পর তাঁর বিরুদ্ধে এই প্রস্তাব আনা হয়।

একই সঙ্গে বিদেশি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার একটি আইন নিয়েও ইরানের পার্লামেন্টে আলোচনা চলছে। এ ধরনের আইন পাস হলে তা কট্টরপন্থীদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।

কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে মধ্যপন্থীরা

পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিশংসনের উদ্যোগ চললেও সরকারের সমর্থক রাজনৈতিক শিবির সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক দাভুদ হেশমাতি মনে করেন, ইরান সরকারকে উৎখাত করার বৃহত্তর লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে এসে তুলনামূলক সীমিত কিছু লক্ষ্য অর্জনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে—এমন ইঙ্গিত রয়েছে। এতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

আলজাজিরাকে হেশমাতি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনের একাধিক পথ রয়েছে, যার একটি যুদ্ধ। তবে যুদ্ধ এড়াতে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পগুলো আগে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আলোচনা ও কূটনৈতিক সমঝোতা সেই বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে এবং যুদ্ধের আগে সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিরোধিতাকারীরা মূলত যুদ্ধের অবসান চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, কয়েক দফা লড়াইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজে থেকেই সংঘাত থেকে সরে যাবে। তবে চলমান পরিস্থিতির বাস্তবতার সঙ্গে এমন ধারণার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হেশমাতি আরও বলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন। তাঁর মতে, শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধই একমাত্র পথ নয়। তবে কূটনৈতিক পথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের অবিশ্বাস তৈরি হওয়াও বোধগম্য।

কট্টরপন্থীরা শক্তিশালী, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁদের হাতে নয়

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভির মতে, ইরানের কট্টরপন্থীরা দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাবশালী ও সুসংগঠিত অংশ। সমর্থকদের সংগঠিত করা, রাজনৈতিক বিতর্কের গতিপথ প্রভাবিত করা, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের রাজনৈতিক মূল্য বাড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে তাঁদের।

তবে রাজনৈতিক প্রভাব থাকা আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এক বিষয় নয় বলে মনে করেন তিনি। যুদ্ধ, শান্তি ও আলোচনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ে।

মোর্তাজাভির ভাষ্য, কট্টরপন্থীরা আলোচনাকারীদের বিরোধিতা করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া কর্মকর্তাদের অভিশংসনের হুমকি দিতে পারেন এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে দেশটির প্রধান ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল কোনো সমঝোতার পক্ষে থাকলে তা ঠেকানোর ক্ষমতা তাঁদের নাও থাকতে পারে।

তিনি বলেন, কট্টরপন্থীরা কূটনীতিকে জটিল করে তুলতে যথেষ্ট শক্তিশালী, কিন্তু তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মতো ক্ষমতা তাঁদের আছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তাঁরা দৃশ্যমান ও সোচ্চার রাজনৈতিক শক্তি হলেও সব সিদ্ধান্ত তাঁদের হাতে নেই।

মোর্তাজাভি আরও বলেন, যুদ্ধ চলাকালে তেহরান কূটনীতির পথ খোলা রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার বিষয়ে দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের উদ্যোগও কট্টরপন্থীরা শেষ পর্যন্ত ঠেকাতে পারেননি বলে তাঁর বক্তব্য।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিরোধিতা করে রাস্তায় সমাবেশ ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান চলতে পারে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিশংসন শুনানির সময়সূচিতে বিলম্ব এবং যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকার বিষয়গুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের রাজনীতিতে মধ্যপন্থীরাও এখনো গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে রয়েছেন।

প্রতিবেদনটির সামগ্রিক চিত্র অনুযায়ী, ইরানের কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা করে সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। তবে সংঘাতের শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধান হবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির ওপর।

সূত্র: আল-জাজিরা

ওয়াইএ
আরও পড়ুন