ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনের মতো আক্রমণাত্মক মনুষ্যবিহীন আকাশযান মোকাবিলায় অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টারের ক্রুদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে ড্রোনের কার্যকর ব্যবহার নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করায় হেলিকপ্টারগুলোকে কীভাবে এ ধরনের হুমকি প্রতিহত করার উপযোগী করা যায়, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ‘স্কাইফল-২’ নামের একটি সামরিক মহড়ায় অংশ নেয় মার্কিন সেনাবাহিনীর ২-১৫৯তম অ্যাটাক ব্যাটালিয়নের অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের ক্রুরা। মহড়ায় তাদের লক্ষ্য ছিল ‘আউটল’ নামের প্রপেলারচালিত ড্রোন। এসব ড্রোনের ডানার বিস্তার প্রায় ১১ ফুট, যা রাশিয়া ও ইরানের দূরপাল্লার শাহেদ আক্রমণকারী ড্রোনের সঙ্গে তুলনীয়।
মহড়ায় অ্যাপাচি হেলিকপ্টার থেকে ৩০ মিলিমিটারের প্রশিক্ষণ গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ব্যবহার করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি উড্ডয়নের সময় একটি ক্রু দল উৎক্ষেপণ করা চারটি ড্রোনই ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। এই অনুশীলনের মাধ্যমে তুলনামূলক ধীরগতির ও সাধারণ নকশার ড্রোনের বিরুদ্ধে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে। তবে মহড়ায় সফলতা বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে একই ধরনের ফল নিশ্চিত করে না। বাস্তবে ড্রোন শনাক্ত করা, লক্ষ্য নির্ধারণ, অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শাহেদ ড্রোনের নকশা তুলনামূলক সরল এবং এর গতি অনেক যুদ্ধবিমানের চেয়ে কম। কিন্তু এ ধরনের ড্রোনের ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে এ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রায় সব প্রাণহানির জন্য দায়ী ছিল শাহেদ ড্রোন। তবে এ দাবির বিস্তারিত পরিসংখ্যান বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনের সরবরাহ করা অংশে নেই।
ড্রোনের গতি কম হলেই সেটিকে সহজে প্রতিহত করা যায় না। ছোট আকার, তুলনামূলক কম উচ্চতায় উড্ডয়ন এবং একাধিক ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহারের কারণে শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের কাজ জটিল হতে পারে। এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় শুধু ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রনির্ভর প্রতিরক্ষা নয়, বিকল্প অস্ত্র ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনে হরমুজ প্রণালির ওপর একটি শাহেদ ড্রোনের ঘটনায় একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়েছিল। হেলিকপ্টারটির দুই পাইলটই প্রাণে বেঁচে যান। তবে ড্রোনটি ইচ্ছাকৃতভাবে হেলিকপ্টারটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, না-কি দুর্ঘটনাবশত দুই আকাশযানের সংঘর্ষ হয়েছিল তা স্পষ্ট নয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মুখোমুখি সংঘাতের ঝুঁকি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষার পরিকল্পনায় শুধু স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তু নয়, আকাশে থাকা সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলোকেও ড্রোনের সম্ভাব্য হুমকি থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
অ্যাপাচি হেলিকপ্টার মূলত স্থলযুদ্ধে শত্রুর সাঁজোয়া যান, অবস্থান ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি। এখন এ ধরনের হেলিকপ্টারকে ড্রোন প্রতিরোধের কাজে ব্যবহার করার সম্ভাবনা যাচাই করছে মার্কিন সেনাবাহিনী। এই প্রশিক্ষণ ড্রোনযুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন। তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল মনুষ্যবিহীন আকাশযানও শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে নতুন অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।