ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) । ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, পশ্চিম তীর ও লেবানন ঘিরে সংঘাত, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনকে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় থাকতে পারবে কি না, বিরোধীরা সরকার গঠনের মতো আসন পাবে কি না এবং আরব দলগুলোর সমর্থন শেষ পর্যন্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—এসব প্রশ্ন নির্বাচনের ফল ও পরবর্তী সরকার গঠনের আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
আলজাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে পাঁচটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. প্রধান দল ও জোট কোনগুলো, জরিপে কী ইঙ্গিত?
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের আসনসংখ্যা ১২০। কোনো দলকে আসন পেতে জাতীয় ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ অর্জন করতে হয়।
নির্বাচনে মূলত দুটি রাজনৈতিক শিবির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট: এই শিবিরের কেন্দ্রে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। এর সঙ্গে রয়েছে কয়েকটি ডানপন্থী ও অতি-অর্থোডক্স ধর্মীয় দল। এর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, শাস, ইতামার বেন-গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম-জেহুত।
বিরোধী শিবির: এ শিবিরে রয়েছে সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি, সাবেক উপসামরিক প্রধান ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটস, সাবেক অর্থমন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন টুগেদার জোট। এ জোটে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদও যুক্ত রয়েছেন।
নতুন জরিপ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে কোনো শিবিরই ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে ছিল না।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান-এর একটি জরিপে বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫২ এবং নেতানিয়াহুর জোটের ৫০ বলে অনুমান করা হয়েছিল। বাকি আসনগুলো অন্যান্য ও অনির্ধারিত রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে দুটি প্রধান আরব-সমর্থিত রাজনৈতিক তালিকা—রাআম এবং জয়েন্ট লিস্ট।
তবে জনমত জরিপ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নয়। ভোটের ফল, আসন বণ্টন এবং সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর সমঝোতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কারা ক্ষমতায় যাবে।
২. নির্বাচনের প্রধান ইস্যু কী?
এবারের নির্বাচনে ইসরায়েলিদের সামনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই ধরনের সংকটই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা ও জবাবদিহি: ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি রয়েছে। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের ভূমিকা নির্বাচনী বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক দায়িত্ব: অতি-অর্থোডক্স বা হারেদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে ছাড় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। একদিকে সামরিক দায়িত্বের সমতা প্রতিষ্ঠার দাবি, অন্যদিকে ধর্মীয় শিক্ষার স্বাধীনতা ও সম্প্রদায়টির অবস্থান—দুইয়ের মধ্যে বিরোধ রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলছে।
বিচারব্যবস্থা সংস্কার: নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব উদ্যোগ ইসরায়েলের উদার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা দুর্বল করতে পারে। সমর্থকেরা অবশ্য বিচারব্যবস্থার ক্ষমতা ও ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণের পক্ষে যুক্তি দিয়ে থাকেন।
যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি: গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাতের মধ্যে ভোটারদের একটি বড় প্রশ্ন—ইসরায়েল কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। যুদ্ধের ক্লান্তি থাকলেও ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা প্রশ্নে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে জনমতের মধ্যে অনীহাও রয়েছে।
৩. কেন এবারের নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ?
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম নির্বাচন। ফলে নিরাপত্তা, সরকারের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে ভোটারদের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে ইসরায়েলি সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি বলেন, ইসরায়েলি সমাজে আগে থেকেই থাকা সহিংসতা ও ডানপন্থী বক্তব্যের প্রবণতা বর্তমান সরকারের আমলে আরও তীব্র হয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে দেশটির কয়েকটি মিত্র দেশের নিষেধাজ্ঞা এবং গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযানের সমালোচনা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় বিভিন্ন দেশের বহু প্রতিনিধি অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে ঘিরে বিরোধের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে ওঠে।
নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে—পরবর্তী সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে বর্তমান নীতি বজায় রাখবে, নাকি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।
৪. নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য কী অর্থ বহন করছে এই ভোট?
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন মেয়াদ মিলিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে ২০২৩ সালের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন এবং তাঁর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাগুলো তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে বিতর্কের মধ্যে রেখেছে।
২০১৯ সাল থেকে চলা দুর্নীতির মামলাগুলোতে নেতানিয়াহু অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এসব মামলার চূড়ান্ত পরিণতি এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
নির্বাচনে তাঁর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে সম্ভাব্য তদন্ত কমিশনের কার্যক্রম ও তার পরিধি নিয়েও নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ-সংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। বিষয়টি তাঁর আন্তর্জাতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করছে। তবে এ পরোয়ানা নিজে কোনো আদালতের চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্ত করার রায় নয়।
৫. ফিলিস্তিনি নাগরিক ও আরব দলগুলোর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবারের নির্বাচনে ইসরায়েলের প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিকের ভোট দেওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।
অন্যদিকে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী প্রায় ৩০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনি এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন না। অথচ ইসরায়েলের নীতি তাঁদের চলাচল, সীমান্ত ও আইনি অবস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক জরিপে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটদানের হার ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। ভোটের বড় অংশ আরব দলগুলোর পক্ষে গেলে নেসেটে তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়তে পারে। ভোটদানের হার ৬৫ শতাংশে পৌঁছালে এসব দল সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ ১৫টি আসন পেতে পারে বলে কিছু পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এগুলো জরিপভিত্তিক অনুমান, চূড়ান্ত ফল নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জয়েন্ট লিস্ট ও রাআমকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দল দুটিকে নির্বাচনে থাকার সুযোগ দেয়। তবে জয়েন্ট লিস্টের নেতা সামি আবু শাহাদেহকে ৭ অক্টোবরের হামলাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করা একটি নিবন্ধের কারণে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরব দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান এবারের নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। নেতানিয়াহুর জোট ও প্রধান বিরোধী শিবির—দুই পক্ষই আপাতত আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের জোটে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। কিন্তু কোনো শিবিরই ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে এসব দলের সমর্থন সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বদলে দিতে পারে।
নেতানিয়াহু বারবার দাবি করেছেন, বিরোধীরা ক্ষমতায় গেলে আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে পারে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতাকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরার কৌশল সরকার গঠনের সমীকরণকে আরও জটিল করতে পারে।
আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির লেখক জোসেফ মানসুরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিরোধী শিবির ৬১ আসন না পেলে এবং আরব দলগুলোর সমর্থন রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়লে সরকার গঠনে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। সে পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত কী নির্ধারণ করবে নির্বাচনের ফল?
ইসরায়েলের নির্বাচনে শুধু কোন দল সবচেয়ে বেশি ভোট পেল, সেটিই চূড়ান্ত প্রশ্ন নয়। ১২০ আসনের নেসেটে ৬১ আসনের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা সম্ভব কি না, সেটিই হবে মূল বিষয়।
নির্বাচনের ফল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা নীতি, বিচারব্যবস্থা সংস্কার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আরব দলগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোন পক্ষ সরকার গঠন করবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে ভোট গণনা ও জোট আলোচনা শেষ হওয়ার আগে নয়।
সূত্র: আল-জাজিরা