ইসরায়েলের নির্বাচনে সরকার গঠনের চাবি কার হাতে? 

ইসরায়েলের নির্বাচনকে ঘিরে মূল প্রশ্ন শুধু বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কি-না, তা নয়। নির্বাচনের পর কোন রাজনৈতিক শিবির সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। আর এ হিসাবের কেন্দ্রে উঠে আসতে পারে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন। কোনো শিবির এককভাবে এই সংখ্যা অর্জন করতে না পারলে ছোট দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো- যাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা করতে প্রধান শিবিরগুলোর একাংশের অস্বস্তি রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সম্ভাবনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো কতটি আসন পায় এবং নির্বাচনের পর তারা কোন পক্ষকে সমর্থন করে, তার ওপর সরকার গঠনের আলোচনা নির্ভর করতে পারে।

সংখ্যার খেলায় ছোট দলগুলোর গুরুত্ব

ইসরায়েলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটাররা দলীয় তালিকায় ভোট দেন এবং প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে দলগুলো নেসেটে আসন পায়। তবে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব পেতে দলকে নির্ধারিত ন্যূনতম ভোটের সীমা অতিক্রম করতে হয়। এই ব্যবস্থায় বড় রাজনৈতিক জোটগুলো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে ছোট দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কোনো শিবির ৬১ আসনের লক্ষ্য থেকে এক বা দুই আসন দূরে থাকলে কয়েকটি আসন পাওয়া দলও সরকার গঠনের আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

তবে ইসরায়েলের আরব রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা'আম এবং অন্য আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, নীতি ও ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।

নির্বাচনের পর তাদের অবস্থান নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে- তারা কতটি আসন পেয়েছে, সম্ভাব্য অংশীদাররা কী ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এবং সেই সমঝোতা আরব ভোটারদের স্বার্থে কতটা কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারে সরাসরি যোগ দেওয়া এবং বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো দল মন্ত্রিসভায় যোগ না দিয়েও পার্লামেন্টে ভোটের মাধ্যমে সরকার টিকিয়ে রাখা বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারে।

নেতানিয়াহু-বিরোধীদের রাজনৈতিক দ্বিধা

নেতানিয়াহুর বিরোধী শিবিরের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো- সরকার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে গিয়ে এমন রাজনৈতিক সমঝোতা করতে হতে পারে, যা তাদের নিজস্ব সমর্থকদের একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধ ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিতর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। নিরাপত্তা, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটির সমাজে মতপার্থক্য রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটে ডানপন্থী ও ধর্মীয় দল রয়েছে; তাদের মধ্যে কয়েকটি দল ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে ছাড় দেওয়ার বিরোধিতা করে। ফলে নেতানিয়াহুর বিরোধীদের সামনে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নয়, নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য সামলে একটি কার্যকর সরকার গঠনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রধান রাজনৈতিক শিবিরগুলো নির্বাচনী প্রচারে বিষয়টিকে প্রকাশ্যে সামনে আনতে সতর্ক থাকতে পারে।

২০২১ সালের নজির

ইসরায়েলে আরব দলের সমর্থন যে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হতে পারে, তার নজির রয়েছে ২০২১ সালে। ওই বছর মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা'আম দল নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত জোটে যোগ দিয়েছিল। সেই সমঝোতার মাধ্যমে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে।

ঘটনাটি দেখিয়েছিল, আরব নেতৃত্বাধীন একটি দলও ইসরায়েলের সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিতে পারে। তবে সেই সরকার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর যুদ্ধ রাজনৈতিক সহযোগিতার পরিবেশকে আরও জটিল করেছে। তবু ২০২১ সালের অভিজ্ঞতা বর্তমান নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। কারণ নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক দলগুলো যে অবস্থান নেয়, ফল ঘোষণার পর সরকার গঠনের আলোচনায় বাস্তবতার কারণে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার প্রয়োজন হতে পারে।

আরব ভোটারদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ

নির্বাচনের ফল শুধু বড় দলগুলোর জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করবে না। ভোটার উপস্থিতি, ছোট দলগুলোর মধ্যে ভোটের বণ্টন এবং কোন দলগুলো ন্যূনতম ভোটের সীমা অতিক্রম করে পার্লামেন্টে প্রবেশ করতে পারে, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে আরব ভোটারদের উপস্থিতি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসনসংখ্যায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বেশি আসন পেলেই তারা সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা নির্ভর করবে নেতানিয়াহুর শিবিরের আসনসংখ্যা এবং বিরোধী দলগুলো বিকল্প সরকার গঠনের জন্য কতটা কার্যকর সমঝোতা করতে পারে, তার ওপরও।

নির্বাচনের পরই স্পষ্ট হবে প্রকৃত সমীকরণ

ইসরায়েলের নির্বাচনী লড়াই প্রকাশ্যে নেতানিয়াহু ও তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ফল ঘোষণার পর সরকার গঠনের আলোচনা আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক হিসাব সামনে আনতে পারে। কোনো পক্ষ ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে তাদের ভূমিকা কতটা নির্ণায়ক হবে, তা আগাম নিশ্চিত করে বলা যায় না। নির্বাচনের ফল, দলগুলোর আসনসংখ্যা, সম্ভাব্য জোটের শর্ত এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থাই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে আরব দলগুলো সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে।