তিন বছরের যুদ্ধ, বারবার বাস্তুচ্যুতি, বিমান হামলা ও অবরোধের মধ্যে থাকা গাজার ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে তাকিয়ে আছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। তাঁদের আশা, ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে হয়তো যুদ্ধের তীব্রতা কমবে, অবরোধ শিথিল হবে এবং ঘরে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন সরকার এলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে তাঁদের সংশয় রয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সেখানকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ থামেনি। প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি বিমান হামলার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করছেন ফিলিস্তিনিরা। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট, মানবিক বিপর্যয় এবং কঠোর অবরোধের মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলের নতুন সরকার নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন দেশটির নাগরিকেরা। গাজায় যুদ্ধ এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার আগে ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাঁর সরকারের কট্টর ডানপন্থি কয়েকজন নেতা গাজা নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন। এমনকি গাজার বাসিন্দাদের বিতাড়িত করার আহ্বানও জানিয়েছেন তাঁরা।
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের নির্বাচনের ফল নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গাজার বাসিন্দারা। তাঁদের কেউ কেউ বিরোধী নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের জয়ের আশা করছেন। তবে নেতৃত্ব বদলালেই যে তাঁদের দুর্ভোগের অবসান হবে, এমন নিশ্চয়তা দেখছেন না তাঁরা।
নেতৃত্ব বদলের আশায় বাস্তুচ্যুত পরিবার
গাজার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ এলিয়ান এখন পাঁচ সন্তানকে নিয়ে দেইর আল-বালাহ এলাকায় বসবাস করছেন। বারবার ঘরছাড়া হওয়া ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর তিনি আশা করছেন, ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে ফিলিস্তিনিদের জন্য কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে কে ক্ষমতায় আসছেন, তা জানতে তাঁরা ইসরায়েলের নির্বাচন অনুসরণ করছেন। ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের দুর্দশা কিছুটা লাঘব হবে—এমন আশাও করছেন তাঁরা।
এলিয়ান মনে করেন, নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট প্রধানমন্ত্রী হলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও কট্টর ডানপন্থি মিত্ররা আবার ক্ষমতায় এলে গাজায় যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি আরও বাড়তে পারে।
তবে নেতৃত্ব বদলালেও ইসরায়েলের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন না তিনি। এলিয়ানের ভাষায়, ইসরায়েল এখনো তাঁদের শত্রু। তারপরও নেতানিয়াহুর তুলনায় নতুন কেউ কম কঠোর হতে পারেন—এমন আশা রয়েছে।
ইসরায়েলের পরবর্তী নেতার কাছে তাঁর প্রত্যাশা, যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, গাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা ও অনাহারে রাখার পরিস্থিতি ঠেকাতে হবে এবং গাজার প্রবেশপথগুলোতে বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে।
‘আমাদের জীবন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত’
উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৪১ বছর বয়সী ইসলাম সালেম তিন মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েলের নির্বাচনের ফল গাজার ভবিষ্যৎ এবং তাঁর সন্তানদের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, রাজনীতি তাঁদের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। জীবনযাত্রার পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব রয়েছে।
তবে সালেমের আশঙ্কা, নতুন মুখ সরকারে এলেও গাজা নিয়ে ইসরায়েলের মূল নীতিতে পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তাঁর মতে, ইসরায়েলের রাজনীতি মূলত নিজেদের স্বার্থকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়।
গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা ‘ইয়েলো লাইন’-এর ভেতরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যুদ্ধের কারণে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এসব ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় গাজায় পুনর্গঠন শুরু হওয়া নিয়েও সন্দিহান সালেম। তাঁর আশঙ্কা, ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করার বদলে ইসরায়েল নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে চাইতে পারে।
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার শক্তিও কেড়ে নিয়েছে। সালেম বলেন, তাঁরা এখন প্রতিদিনের জীবন নিয়েই ব্যস্ত। সামনে কী ঘটবে, তা জানেন না। যেসব বিপদের আশঙ্কা করতেন, সেগুলোর অনেক কিছুই ইতিমধ্যে তাঁদের জীবনে ঘটেছে।
ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর একটাই আবেদন—গাজার মানুষকে তাঁদের মতো করে বাঁচতে দেওয়া হোক, কিছুটা স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।
১২ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত, তবু ঘরে ফেরার স্বপ্ন
গাজার ৫৭ বছর বয়সী হানান আবু আল-মাআজা যুদ্ধের সময় ১২ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার তাঁদের জীবনে আরও দুর্ভোগ ডেকে আনতে পারে—এমন আশঙ্কা তাঁর।
তিনি বলেন, ভয় ও উদ্বেগ থেকেই তাঁরা ইসরায়েলের নির্বাচন অনুসরণ করছেন। বারবার ঘরছাড়া হওয়ার পরও তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি। রাতে ঘুমাতে গেলেও পরদিন কী ঘটবে, সেই ভয় তাঁদের তাড়া করে বেড়ায়।
নেতানিয়াহু পরাজিত হলে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় নিজের বাড়িতে ফেরার সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে আশা করেন হানান। তাঁর চাওয়া, নতুন নেতৃত্ব যেন গাজার মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে এবং তাঁদের ঘরে ফেরার সুযোগ দেয়।
হানানের মতে, গাজায় এত ধ্বংসযজ্ঞের পর নতুন করে ধ্বংস করার মতো খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট নেই। এখন যুদ্ধ ও ধ্বংস বন্ধ করে মানুষকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে দেওয়াই জরুরি।
নীতির পরিবর্তন নিয়ে সংশয়ে তরুণী
গাজার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী মানার ওবাইদা এখন গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রচার ও নেতাদের বক্তব্য অনুসরণ করছেন তিনি, যাতে নতুন সরকার গাজার পরিস্থিতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা বুঝতে পারেন।
ওবাইদার আশা, গাদি আইজেনকট নেতানিয়াহুর স্থলাভিষিক্ত হবেন। তাঁর চোখে নেতানিয়াহু প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় বেশি কঠোর। তবে তিনি মনে করেন, ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন হলেও ফিলিস্তিনিদের জীবন রাতারাতি বদলে যাবে না। তাঁর অভিযোগ, ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতিতে হত্যা, ধ্বংস ও অবরোধের ধারাবাহিকতা রয়েছে।
তারপরও নতুন সরকার অবরোধ ও হামলা কমাবে এবং ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে—এমন আশা করছেন ওবাইদা। এতে গাজায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তবে নির্বাচনের সময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এড়াতে নেতানিয়াহু বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত উসকে দিতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন তিনি। ওবাইদার চাওয়া, ফিলিস্তিনিরা যেন নতুন করে সহিংসতার শিকার হওয়ার ভয় ছাড়াই স্বাধীনতা ও শান্তির মধ্যে বাঁচতে পারেন।
‘রক্তপাত বন্ধ হোক’
উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৩ বছর বয়সী মুসা আলী এখন চার সন্তানকে নিয়ে গাজা সিটিতে রয়েছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে থাকা এলাকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের ফেরার সুযোগ।
আলী আশা করেন, বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে বাস্তুচ্যুতদের নিজ নিজ এলাকায় ফেরার বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারে। পাশাপাশি পরবর্তী সরকারে আরব দলগুলো ভালো ফল করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুক—এটিও তাঁর প্রত্যাশা।
তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী এলেই গাজার মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন না তিনি। তাঁর আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় এলে বাস্তুচ্যুতি ও ‘ইয়েলো লাইন’-সংলগ্ন এলাকায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকতে পারে।
আলী বলেন, গাজায় প্রতিদিন মানুষ নিহত হচ্ছেন এবং বোমা হামলা চলছে। এই নীতি বন্ধ করে চলমান রক্তপাত থামাতে নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গাজার মানুষের প্রত্যাশা, ইসরায়েলের নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক, নতুন সরকার যেন যুদ্ধ বন্ধ, অবরোধ শিথিল, পুনর্গঠন এবং বাস্তুচ্যুতদের ঘরে ফেরার পথ তৈরি করে। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে আশার পাশাপাশি গভীর অনিশ্চয়তাও তৈরি করেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
নেতানিয়াহু নাকি আইজেনকট, কার দিকে ভোটাররা?
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু
ইসরায়েলের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি ভোটার কত?
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট হয় যেভাবে, সরকার গঠনের নিয়ম কী?
ইসরায়েলের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস