ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে 'বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন' হয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র: হিজবুল্লাহ প্রধান

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে আগের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশটিকে ধীরে ধীরে সরে যেতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাইম কাসেম।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। হিজবুল্লাহর সংবাদমাধ্যম আল-মানারে বিবৃতিটি প্রকাশিত হয়। খবর মেহের নিউজ এজেন্সির (এমএনএ)।

নাইম কাসেমের দাবি, ইরানের জনগণের প্রতিরোধ এবং দেশটির নেতৃত্বের দৃঢ় অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে ঘিরে তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং দেশটিকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা সফল হয়নি।

বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ প্রধান ইসরায়েলকে ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বরের চুক্তি এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানান তিনি।

নাইম কাসেম বলেন, দখলদারত্ব ও আগ্রাসন অব্যাহত থাকা অবস্থায় হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নে আলোচনার সুযোগ নেই। তাঁর দাবি, লেবাননের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে এবং দেশটির ওপর হামলার বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নেবে।

লেবাননের সংবিধান, তায়েফ চুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে একটি কথিত কাঠামোগত চুক্তির বৈধতাও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের চুক্তি লেবাননের শক্তির উৎস দুর্বল করবে এবং দেশের অভ্যন্তরে বিভেদ বাড়াবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টিকে লেবাননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন হিজবুল্লাহ প্রধান। তাঁর বক্তব্য, প্রতিরোধের দৃঢ়তা, লেবাননের জনগণ ও সমর্থকদের পাশাপাশি এ সমঝোতাও শক্তির একটি উৎস।

নাইম কাসেমের দাবি, সমঝোতা-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক চালুর পর লেবাননের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের মাত্রা কমেছে। তিনি বলেন, ইরান তার অগ্রাধিকারের তালিকায় লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করা এবং দেশটির ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

ইরানের এই অবস্থানকে তিনি স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ ত্যাগ হিসেবে অভিহিত করেন।

বিবৃতিতে নাইম কাসেম লেবাননের জনগণের মধ্যে সংহতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি হিজবুল্লাহ, আমাল মুভমেন্ট এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে সম্পর্ক অটুট থাকার কথাও উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা জোরদার, অভ্যন্তরীণ সংঘাত প্রতিরোধ এবং দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখা জরুরি।

তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে জনগণের পাশে থাকবে। এ কাজে নিজেদের সামর্থ্য ও প্রচেষ্টার পাশাপাশি বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সহায়তাও নেওয়া হবে।

নাইম কাসেম আরও বলেন, জাতীয় ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি বিভেদ দূর করতে অন্য পক্ষগুলোর কাছ থেকেও বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চায় হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহ প্রধানের অভিযোগ, ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক অভিযান কেবল নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পেছনে বৃহত্তর ভূখণ্ড সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে দখলদারত্ব সুসংহত করা কিংবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতো না।

গাজা, পশ্চিম তীর ও ফিলিস্তিনের অন্যান্য অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্যও তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সমর্থনকে দায়ী করেন। তাঁর বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি মাদ্রিদ ও অসলো চুক্তির উদাহরণ টেনে বলেন, ইসরায়েল বিভিন্ন চুক্তি করলেও সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। তাঁর মতে, এসব চুক্তি দখলদারত্ব স্থায়ী করার সুযোগ তৈরি করেছে।

নাইম কাসেমের ভাষ্য, ইরান যুদ্ধের সময় প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হলেও দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব কমে যাওয়ার মতো সমস্যায় রয়েছে। এর বিপরীতে ইরানের জনগণ ও নেতৃত্ব দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বের প্রশংসা করে নাইম কাসেম বলেন, ইরানি জনগণের প্রতিরোধ এবং নেতৃত্বের সাহসী অবস্থান এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিই প্রভাব হারাচ্ছে কি না কিংবা অঞ্চলটি থেকে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না—তা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সামরিক ও কূটনৈতিক তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। নাইম কাসেমের বক্তব্যকে এ ক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক অবস্থান ও মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা উচিত।