স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দেশটির তোলেদো প্রদেশের উর্দা শহরের কাছে মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রেন পরিচালনার কম্পিউটার ব্যবস্থায় ত্রুটি এবং সম্ভাব্য মানবিক ভুল দুর্ঘটনার কারণ হয়ে থাকতে পারে।
দুর্ঘটনার সময় স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের একটি দ্রুতগতির ট্রেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি সংস্থা ইরিওর ট্রেনটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। ওই এলাকায় ট্রেন পরিচালনার নিরাপত্তাব্যবস্থা এলজেডবি-তে সমস্যা দেখা দেওয়ায় রেল চলাচল ব্যাহত ছিল।
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানান, রেলপথের প্রায় ৬৩ কিলোমিটার এলাকায় কম্পিউটার ব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে নিরাপত্তাব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়। ফলে ওই এলাকার ট্রেনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যায়।
এরপর দেশটির রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা এডিআইএফ (ADIF) ব্যবস্থাটির নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। এ সময় লাল সংকেত থাকা সত্ত্বেও রেনফের ট্রেনটিকে দক্ষিণমুখী পথে চলার অনুমতি দেওয়া হয়। ট্রেন নিয়ন্ত্রকের ভুল নির্দেশের কারণে কোনো গতিসীমা ছাড়াই ট্রেনটিকে চলতে দেওয়া হয়েছিল বলে জানান পরিবহনমন্ত্রী।
পুয়েন্তের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৬ মিনিট থেকে ৮টা ৫২ মিনিটের মধ্যে রেনফের ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করে। ট্রেনটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ১২৪ মাইল বা ২০০ কিলোমিটার ছিল। একপর্যায়ে এটি দাঁড়িয়ে থাকা ইরিওর ট্রেনটিকে ধাক্কা দেয়।
বুধবার সংবাদ সম্মেলনে পরিবহনমন্ত্রী বলেন, চলাচল নিষিদ্ধ করে লাল সংকেত দেওয়া ছিল, অথচ ট্রেনটিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।
পরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পেনের শ্রমিক ইউনিয়ন সিএসআইএফ তাঁর পদত্যাগ দাবি করে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দায়ী না করা এবং এডিআইএফের ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার নির্দোষ থাকার অধিকারকে সম্মান করার আহ্বান জানায় ইউনিয়নটি।
দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রেনফের ট্রেনের ২৪ জন এবং ইরিওর ট্রেনের ৪৪ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন পুয়েন্তে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, কোনো অবহেলা থাকলে তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি পাওয়া গেলে কঠোরভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি বলেন, পুরো স্পেন শোকাহত।
যাত্রীদের বর্ণনায় দুর্ঘটনার ভয়াবহতা
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষের মুহূর্তে ট্রেনের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অনেকে আসন থেকে ছিটকে পড়ে অন্য যাত্রীদের ওপর গিয়ে পড়েন।
এক যাত্রী সিএনএনকে জানান, ট্রেনের তিনটি বগির অবস্থা বিশেষভাবে ভয়াবহ ছিল। একটি বগিতে আগুন ধরে যায়, অন্যটিতে মানুষ আটকা পড়ে কাঁদছিলেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বগিতে ধ্বংসাবশেষের নিচে মানুষ চাপা পড়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
ইয়োআন্দার নামের ২৫ বছর বয়সী এক যাত্রী বলেন, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম ভাঙার পর দেখেন, তিনি সামনের আসনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছেন। তাঁর মুখ ও পায়ে আঘাত লাগে। তবে অন্যদের আরও বেশি সাহায্যের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রেনফের ট্রেনের যাত্রী প্যাট্রিসিয়া জানান, দুর্ঘটনার আগে তাঁদের ট্রেনটি প্রায় ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল। তখন ঘোষণা দিয়ে জানানো হয়েছিল, রেলপথে ট্রেনের চাপ বেশি। পরে ট্রেনটি চলতে শুরু করার তিন মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন যাত্রী শূন্যে ছিটকে পড়েন এবং ট্রেনের কাঠামোর কিছু অংশ তাঁদের বগির ভেতরে ঢুকে যায়।
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা আঞ্চলিক সরকারের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইরিওর ট্রেনে ১৫১ জন এবং রেনফের ট্রেনে ৩৯৩ জন যাত্রী ছিলেন।
উদ্ধারকাজে ৫০০ জনের বেশি কর্মী
দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের বহু গাড়ি পৌঁছায়। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, উদ্ধার ও জরুরি কার্যক্রমে ৫০০ জনের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি অন্তত তিনটি হেলিকপ্টার ও কয়েকটি ড্রোন ব্যবহার করা হয়।
উদ্ধারকর্মীরা ইরিওর ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলোর ধ্বংসাবশেষে তল্লাশি চালান। রেনফের দ্রুতগতির ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে একদিকে কাত হয়ে পড়ে ছিল।
গুরুতর আহত নন—এমন যাত্রীদের বাসে করে দুর্ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের মুখ ও চোখের আশপাশে কেটে যাওয়ার ক্ষত এবং নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো আঘাত ছিল। স্পেন, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক ওই ট্রেনগুলোতে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় কয়েকজন মার্কিন নাগরিক আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনাস্থলের কাছের উর্দা শহরে বহু অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার গাড়ি পৌঁছায়। শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে রেড ক্রসের কর্মীরা আহতদের চিকিৎসা দেন।
নিহতদের দ্রুত শনাক্ত করতে স্পেনের সিভিল গার্ড দেশটির বিভিন্ন শহরে চারটি কার্যালয় খুলেছে। এ ছাড়া আহতদের চিকিৎসায় রক্তের প্রয়োজন মেটাতে আঞ্চলিক সরকার আলকাজার দে সান হুয়ান, সিউদাদ রিয়াল ও তোলেদো শহরে রক্তদানের আহ্বান জানিয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপে কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখছিলেন উদ্ধারকর্মীরা।
এক বছরে স্পেনে তৃতীয় প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা
চলতি বছর স্পেনে এটি তৃতীয় প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা। এর আগে জানুয়ারিতে কর্দোবা প্রদেশে একটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ওই দুর্ঘটনায় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে পাশের লাইনে উঠে পড়েছিল বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিই জানিয়েছিল। এর কয়েক দিন পর বার্সেলোনার কাছে ভারী বৃষ্টির মধ্যে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হলে চালক নিহত হন এবং কয়েক ডজন যাত্রী আহত হন।
জানুয়ারির দুর্ঘটনার আগেই স্পেনের ট্রেনচালকদের ইউনিয়ন সেমাফ দ্রুতগতির রেলপথে উচ্চগতির কারণে কম্পন, রেললাইনের ক্ষয় ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল বলে সিএনএনকে জানিয়েছিল ইউনিয়নটির একটি সূত্র।
পরপর এসব দুর্ঘটনায় স্পেনের রেল অবকাঠামো, কম্পিউটারভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মান নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে চলতি বছরের আগ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য অনেক দেশের তুলনায় স্পেনের রেল নিরাপত্তার রেকর্ড ভালো ছিল।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে স্পেনে প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে রেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ছিল একজনের কম। ওই সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে স্পেনের রেল নিরাপত্তার রেকর্ড ছিল সবচেয়ে ভালো। ইউরোপীয় ইউনিয়নে রেল দুর্ঘটনায় অধিকাংশ মৃত্যু ঘটে রেললাইনে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করা মানুষের। ট্রেনের ভেতরে থাকা যাত্রী বা কর্মীদের প্রাণহানির ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম।
সূত্র: সিএনএন