উত্তর কোরিয়া নিজেদের পূর্ব উপকূলের সাগর লক্ষ্য করে প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী এ তথ্য জানিয়েছে।
দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ (জেসিএস) জানায়, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলীয় শহর ওনসানের কাছ থেকে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিক্ষেপ করা হয়। এগুলো প্রায় ২৫০ কিলোমিটার (১৫৫ মাইল) দূরত্ব অতিক্রম করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সম্ভাব্য আরও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক থাকতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের খবর জানিয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) মধ্যে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।
এ ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কার্যালয় জরুরি বৈঠক করেছে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, উত্তর কোরিয়াকে বারবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের গুরুতর লঙ্ঘন।
দক্ষিণ কোরিয়ার দংগুক বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর কোরিয়াবিষয়ক অধ্যাপক কিম ইয়ং-হিউন বলেন, সীমান্তে উত্তেজনার সঙ্গে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে সীমান্ত পরিস্থিতিই সরাসরি এই পদক্ষেপের কারণ—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নিজেদের ক্রমবর্ধমান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা তুলে ধরাও পিয়ংইয়ংয়ের উদ্দেশ্য হতে পারে।
সীমান্তে বাড়ছে উত্তেজনা
গত ২১ সেপ্টেম্বর দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চলে (ডিএমজেড) দুটি স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হওয়ার পর থেকে সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে।
সিউলের দাবি, উত্তর কোরিয়ার সেনারা মাইনগুলো পুঁতেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া ঘটনাটিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে পিয়ংইয়ংয়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। তবে উত্তর কোরিয়া এ ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ঘটনা সাজিয়ে তোলার অভিযোগ এনেছে।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং গত সপ্তাহে জানান, দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী প্রচারণা প্রচারের জন্য সীমান্তজুড়ে লাউডস্পিকার প্রস্তুত রাখা হবে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, অক্টোবরের শেষ নাগাদ পুরো সীমান্ত এলাকায় এসব লাউডস্পিকার চালু করা হবে। তবে সিউলের বিশ্লেষকেরা সেগুলো বাস্তবে চালু করা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
সিউলের কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম উল-চুল বলেন, উত্তর কোরিয়া এখনই প্রচার কার্যক্রম শুরু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—বিষয়টি এমন না-ও হতে পারে। বরং দেশটি সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে।
সীমান্তে কামান ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন
উত্তর কোরিয়া সীমান্তের কাছাকাছি এমন কিছু কামানও মোতায়েন করেছে, যেগুলো দক্ষিণ কোরিয়ার দিক থেকে দেখা যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানায়, এসব অস্ত্রের অবস্থান অনেকাংশে শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে হতে পারে।
জেসিএসের মুখপাত্র জাং দো-ইয়ং বলেন, উত্তর কোরিয়ার এ পদক্ষেপের পেছনে একাধিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে পুরোনো অস্ত্রব্যবস্থা প্রকাশ্যে প্রদর্শন করাকে শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জং বিনা বলেন, সহজে দেখা যায় এমন জায়গায় কামান মোতায়েন করার সামরিক বা কৌশলগত যুক্তি খুব একটা নেই।
রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা চলতি সপ্তাহে সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়ার তিনটি সাঁজোয়া যান দেখেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো ১২২ মিলিমিটার স্বচালিত কামান। যানগুলোর কামানের নল দক্ষিণ দিকে তাক করা ছিল।
এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার সেনাদের ডিএমজেডের ভেতরে বেড়া নির্মাণ করতেও দেখা গেছে।
জেসিএসের মুখপাত্র জানান, ডিএমজেডকে দুই ভাগে বিভক্ত করা সামরিক সীমারেখার কাছাকাছি উত্তর কোরিয়ার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এ সময় সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনাগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সতর্কতামূলক ঘোষণা দিচ্ছেন এবং প্রয়োজনে সতর্কতামূলক গুলিও ছুড়ছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সামরিক আলোচনা শুরুর জন্য সিউল যে দুটি প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলোর জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে তারা। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়াকে সংলাপে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, উত্তর কোরিয়া সর্বশেষ গত ১২ অক্টোবর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। চলতি বছর দেশটি ১০ বারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স