জাতিসংঘে চিঠি দিয়ে দ. কোরিয়াকে হুঁশিয়ারি দিলো উ. কোরিয়া

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২০ পিএম

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে। স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। একই সময়ে সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় উত্তর কোরিয়ার একটি স্বচালিত কামান দেখা গেছে। ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার (২৫ অক্টোবর) সীমান্তের কাছে কামানটির উপস্থিতি নজরে আসে। উত্তর কোরিয়ার এ ধরনের কামান প্রকাশ্যে মোতায়েনের ঘটনা বিরল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অবস্থিত কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম উল-চুল বলেন, উত্তর কোরিয়ার স্বচালিত কামান এভাবে প্রকাশ্যে দেখা যাওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তাঁর মতে, কামানটি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রদর্শনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া বোঝাতে চাইছে, তারা আলোচনা বা সমঝোতার পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগ করে সীমান্তনীতি কার্যকর করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়াকে সতর্ক থাকার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে, যাতে অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষ এড়ানো যায়।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ জানিয়েছে, রোববার জাতিসংঘে পাঠানো চিঠিতে দেশটির প্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, সেপ্টেম্বরে স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনাকে ব্যবহার করে দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত নির্মাণকাজকে সামরিক অনুপ্রবেশ হিসেবে তুলে ধরছে।

চিঠিতে উত্তর কোরিয়া সতর্ক করে বলেছে, তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হলে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এর ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে, তার সম্পূর্ণ দায়ভার দক্ষিণ কোরিয়াকে নিতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থলমাইন বিস্ফোরণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

উত্তর কোরিয়ার চিঠিটি দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো চিঠির জবাব। দক্ষিণ কোরিয়া ওই চিঠিতে বলেছিল, ২১ সেপ্টেম্বর দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোনে (ডিএমজেড) একটি বিস্ফোরক উত্তর কোরিয়ার সেনারা পুঁতে রেখেছিল। সিউলের দাবি, এ ঘটনা কোরীয় যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন।

ডিএমজেডের তদারকির দায়িত্বে থাকা জাতিসংঘ কমান্ডও জানিয়েছে, সীমান্তের দক্ষিণ পাশে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা একটি মাইন যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তবে এ ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে পিয়ংইয়ং।

দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সোমবার বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার চিঠিতে আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিজেদের কথিত সীমান্ত চিহ্নিতকরণ কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছে সিউল।

সীমান্তের কাছে কামান মোতায়েনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়টি আলাদা কোনো মন্তব্য করেনি। তবে উত্তেজনা প্রশমনে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

চিঠিতে উত্তর কোরিয়া আরও অভিযোগ করেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা তাদের কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। জাতিসংঘ সনদে অন্য রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার বক্তব্য, উত্তর কোরিয়ার সেনারা সামরিক সীমানা রেখা অতিক্রম করলে তাদের ফিরে যেতে সতর্কবার্তা সম্প্রচার করা হয় এবং প্রয়োজনে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয়। এই সামরিক সীমানা রেখাটি দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চলকে বিভক্ত করেছে।

সীমান্তে সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে উত্তর কোরিয়া

ইয়োনহাপের প্রতিবেদনে প্রকাশিত ছবিতে সীমান্তবর্তী দক্ষিণ কোরিয়ার গিমপো শহরের একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে তোলা দৃশ্যে কামানটির উপস্থিতি দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ছবিতে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের সামরিক মহড়ার দৃশ্যও রয়েছে। এসব তৎপরতা দেখা গেছে উত্তর কোরিয়ার কায়েপুং এলাকায়, যা পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে।

গত কয়েক বছর ধরে উত্তর কোরিয়ার সেনারা সামরিক সীমানা রেখার কাছাকাছি কৌশলগত সড়ক ও বেড়া নির্মাণ এবং স্থলমাইন পুঁতে রাখার কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগেও সীমান্তে স্থলমাইন নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ২০১৫ সালে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন সেনা আহত হন। এর জবাবে সিউল ডিএমজেডের অপর পাশে উত্তর কোরিয়াবিরোধী লাউডস্পিকারে প্রচার শুরু করে। এতে দুই দেশের মধ্যে সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। পরে উত্তর কোরিয়া দুঃখ প্রকাশ করলে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে সেই উত্তেজনার অবসান ঘটে।

সাম্প্রতিক চিঠি, স্থলমাইন নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সীমান্তের কাছে কামানের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার সম্ভাবনাও এখনো রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

এমইউ
আরও পড়ুন