যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও সামরিক সংঘাতে জড়াতে পারে ইরান—এমন আশঙ্কার মধ্যে দেশটির সংবাদমাধ্যমে শুরু হয়েছে নতুন করে যুদ্ধের সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা। কেউ বলছেন, যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী নয়; আবার কারও আশঙ্কা, সীমিত সামরিক অভিযানও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলা, নতুন সংঘাতের জন্য ইরানের প্রস্তুতি বাড়ানোর ঘোষণা এবং নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ-অবরোধ এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম আমদানির নতুন তথ্য—সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বৃহস্পতিবার দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে তিনটি ট্যাংকার নৌমাইনে আঘাত করেছে। অন্যদিকে, দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদরেজা আরেফ বলেছেন, কৌশলগত এই জলপথ তেহরানের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। ১২ দিনের ও ৪০ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতিও আগের চেয়ে বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে নতুন যুদ্ধের সম্ভাবনা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত উঠে এসেছে।
যুদ্ধ অনিবার্য নয়, বলছে ইরানের সংবাদপত্র
ইরানের অর্থনীতি বিষয়ক দৈনিক ‘দুনিয়া-ই-ইকতেসাদ’ বলেছে, নতুন যুদ্ধ অনিবার্য নয়। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মতপার্থক্য গভীর হলেও পর্দার আড়ালে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
পত্রিকাটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক রহমান ঘাহরামানপুর বলেছেন, নতুন সংঘাত শুরু হলেও তা কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সামরিক অভিযানও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের অভিযানের সঙ্গে সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও যুক্ত হতে পারে।
ঘাহরামানপুরের আশঙ্কা, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করার লক্ষ্যে আট থেকে ১২ মাসের একটি কৌশল অনুসরণ করা হতে পারে।
‘যুদ্ধ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে’
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম আমদানির জন্য ইরান পাঁচ হাজারের বেশি সামরিক-সংশ্লিষ্ট সংস্থার একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এভাবে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সরঞ্জাম, বিস্ফোরক এবং ভারী ট্রাক আমদানি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই অনুসন্ধান ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে তেহরানের গোপন আমদানি নেটওয়ার্ক ও বিকল্প বাণিজ্যপথ ব্যবহারের প্রচেষ্টার বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এনেছে।
তবে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কাকে অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করছেন না সাবেক ইরানি কূটনীতিক কুরুশ আহমাদি। সংস্কারপন্থী দৈনিক ‘শার্গ’-এ প্রকাশিত এক লেখায় তিনি বলেছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে মতপার্থক্য রয়েছে, তা নতুন যুদ্ধের বিপুল ব্যয় ও ঝুঁকি নেওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আহমাদির মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যকে ইরানে হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে বলেও মনে করেন এই সাবেক কূটনীতিক। এগুলো হলো—কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা, ইরানকে দুর্বল করতে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা অথবা নতুন করে সামরিক অভিযান চালানো।
আহমাদির মতে, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ এখনো রয়েছে। কারণ, দুই দেশের বিরোধের মূল জায়গা অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে নয়; বরং কে আগে কী ধরনের ছাড় দেবে, সেই ক্রম নির্ধারণ নিয়ে।
যুদ্ধ না থাকলেও অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
ইরানের মধ্যপন্থী সংবাদমাধ্যম ‘ফারারু’ দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে।
সাবেক কূটনীতিক ফেরেইদুন মাজলেসির মতে, ইরানের বর্তমান ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—এমন পরিস্থিতি নিজেই বড় অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের বদলে নগদ অর্থ ধরে রাখতে আগ্রহী হচ্ছেন।
এর ফলে নতুন উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থাৎ নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু না হলেও দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার কারণে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
মাজলেসি বলেন, দুই পক্ষই সম্ভাব্য সমঝোতাকে নিজেদের স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করছে। কিন্তু বিরোধ মেটাতে যে ধরনের ছাড় প্রয়োজন, তা দিতে উভয় পক্ষের অনীহা রয়েছে।
তাঁর আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক চাপ তত বাড়বে। এতে শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সামরিক চাপ দিয়ে কি রাজনৈতিক ছাড় আদায় সম্ভব?
ইরানের সংবাদমাধ্যমে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কি তেহরানের কাছ থেকে রাজনৈতিক ছাড় আদায় করতে পারবে, নাকি এর ফলে আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে?
রহমান ঘাহরামানপুরের বিশ্লেষণে বিষয়টি শুধু নতুন করে হামলা হবে কি না, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে ইরান তার প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলছে। অন্যদিকে, দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করা হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা ও সামরিক প্রস্তুতির মধ্যেও ইরানের অভ্যন্তরীণ সংবাদমাধ্যমে নতুন যুদ্ধ নিয়ে একক কোনো মূল্যায়ন নেই। কেউ যুদ্ধের ঝুঁকি দেখছেন, কেউ কূটনীতির সম্ভাবনা খুঁজছেন, আবার কেউ মনে করছেন—যুদ্ধ ছাড়াই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে।