সুন্নি ও শিয়া মতাদর্শের পার্থক্য থেকে ইসলামের নেতৃত্ব, পবিত্র দুই মসজিদের তত্ত্বাবধান, হজ ব্যবস্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার—সৌদি আরব ও ইরানের বিরোধের পেছনে রয়েছে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক নানা কারণ। তবে দুই দেশের সংঘাতকে শুধু সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্ব বললে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না।
মুসলিম বিশ্বের দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র সৌদি আরব ও ইরান। একটি সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ, অন্যটি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ। দুই দেশের মধ্যে ধর্মীয় মতাদর্শের পার্থক্য বহু পুরোনো হলেও আধুনিক রাষ্ট্রীয় সংঘাতের রূপটি স্পষ্ট হয় বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর। এরপর থেকে ধর্মীয় পরিচয়, ইসলামের নেতৃত্ব, আঞ্চলিক আধিপত্য, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক আদর্শ—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক জটিল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের ধর্মীয় দ্বন্দ্বের মূল জায়গা কোথায়? কোন বিষয়ে সুন্নি ও শিয়া মতাদর্শের পার্থক্য? আর সেই পার্থক্য কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে?
বিরোধের ঐতিহাসিক শিকড়: নবী-পরবর্তী নেতৃত্বের প্রশ্ন
সৌদি আরব ও ইরানের ধর্মীয় পার্থক্যের শিকড় ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়।
যাঁরা মনে করেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব সাহাবিদের পরামর্শ ও সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত ছিল, তাঁরা ঐতিহাসিকভাবে সুন্নি ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। অন্যদিকে, যাঁরা মনে করেন, মহানবী (সা.)-এর পর হজরত আলী (রা.) এবং তাঁর বংশধরদের নেতৃত্বের বিশেষ ধর্মীয় অধিকার ছিল, তাঁরা শিয়া ধারার অনুসারী হিসেবে পরিচিত হন।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই নেতৃত্বের মতপার্থক্য ধর্মতত্ত্ব, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, ইমামত, ফিকাহ ও ইবাদতের কিছু পদ্ধতিগত পার্থক্যে বিস্তৃত হয়।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের গবেষণা শাখা European Parliamentary Research Service-এর ২০১৬ সালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নবী-পরবর্তী মুসলিম নেতৃত্বের প্রশ্ন থেকেই সুন্নি-শিয়া বিভাজনের সূত্রপাত। সময়ের সঙ্গে এই মতপার্থক্য স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয় ও বিধিব্যবস্থায় রূপ নেয়।
তবে সুন্নি ও শিয়া—উভয় সম্প্রদায়ই আল্লাহর একত্ব, মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত, কোরআন, নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজের মতো ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও ইবাদত স্বীকার করে। তাই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তাদের আলাদা ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক নয়।
সৌদি আরব সুন্নি, ইরান শিয়া: ধর্মীয় মতাদর্শের পার্থক্য কোথায়?
সৌদি আরবের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সুন্নি। দেশটির ধর্মীয় ইতিহাসে হাম্বলি মাজহাব এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত ওয়াহাবি বা সালাফি ধারার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াহাবি ধারায় তাওহিদ, ধর্মীয় বিশুদ্ধতা এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের অনুশীলন অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ইরানের অধিকাংশ মুসলমান দ্বাদশ ইমামপন্থি শিয়া বা ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী। এই ধারায় হজরত আলী (রা.) থেকে শুরু করে তাঁর বংশধরদের মধ্যে নির্ধারিত ১২ জন ইমামকে বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হয়। শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বাদশ ইমাম মুহাম্মদ আল-মাহদি অদৃশ্য অবস্থায় রয়েছেন এবং শেষ সময়ে তাঁর আবির্ভাব ঘটবে।
দুই ধারার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো ধর্মীয় কর্তৃত্বের ধারণা। সুন্নি ইসলামে কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে ধর্মীয় বিধান নির্ধারণে আলেম ও ফিকাহবিদদের ভূমিকা রয়েছে। শিয়া দ্বাদশ ইমামপন্থি ধারায় ইমামদের বিশেষ ধর্মীয় কর্তৃত্ব স্বীকৃত। তাঁদের অনুপস্থিতিতে উচ্চপর্যায়ের ধর্মীয় পণ্ডিত বা আয়াতুল্লাহদের ব্যাখ্যা ও নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নামাজের কিছু পদ্ধতি, আজান, ধর্মীয় দিবস পালন, আশুরার আনুষ্ঠানিকতা এবং ফিকাহর কিছু বিধানেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে এসব পার্থক্যকে কেন্দ্র করে সব সুন্নি বা সব শিয়া মুসলমানের মধ্যে বিরোধ রয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (CFR) তাদের সুন্নি-শিয়া বিভাজনবিষয়ক বিশ্লেষণে বলেছে, দুই সম্প্রদায়ের মানুষ বহু শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করেছেন। অনেক দেশে তাঁদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ও একই মসজিদে নামাজ আদায়ের নজিরও রয়েছে। ধর্মীয় বিভাজন থাকলেও সেটি সব সময় সংঘাতের কারণ হয়নি।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব কেন সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দিল?
আধুনিক সৌদি-ইরান বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লব। ওই বিপ্লবে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
নতুন ইরানি শাসনব্যবস্থা শুধু দেশের রাজনৈতিক কাঠামো বদলায়নি; মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কেও একটি বিকল্প আদর্শ তুলে ধরে। খোমেনি মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য এবং পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা বলেন। তাঁর নেতৃত্বে ইরান শিয়া ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি বিপ্লবী ইসলামি আদর্শকে পররাষ্ট্রনীতির অংশ করে তোলে।
সৌদি আরবের শাসনব্যবস্থা ছিল রাজতান্ত্রিক। দেশটির রাজপরিবার ইসলামি পবিত্র দুই মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিজেদের বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরে। বিপরীতে, ইরানের বিপ্লবী নেতৃত্ব সৌদি রাজতন্ত্রের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান United States Institute of Peace (USIP)-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুই দেশই নিজেদের ইসলামভিত্তিক আদর্শিক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে ইরানে ধর্মীয় নেতাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ, আর সৌদি আরবে রাজতন্ত্রের অধীনে ধর্মীয় আলেমদের প্রভাব থাকলেও চূড়ান্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা রাজপরিবারের হাতে।
এই ভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও জটিল করে তোলে।
ইসলামের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে?
সৌদি আরবের জন্য ধর্মীয় মর্যাদার অন্যতম ভিত্তি হলো মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের তত্ত্বাবধান। দেশটির বাদশাহর সরকারি উপাধি ‘দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম’। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে এই দায়িত্ব সৌদি আরবকে বিশেষ ধর্মীয় অবস্থান দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানও মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক ইসলামি রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে আসছে। দেশটির বিপ্লবী নেতৃত্ব নিজেদের শুধু ইরানের শিয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং নিপীড়িত মুসলমানদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একটি শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
এখানেই দুই দেশের মধ্যে প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের ধর্মীয় মর্যাদার ভিত্তি পবিত্র দুই মসজিদের তত্ত্বাবধান এবং সুন্নি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান। ইরানের প্রভাবের ভিত্তি শিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিপ্লবী আদর্শ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত দিলীপ হিরোর Cold War in the Islamic World: Saudi Arabia, Iran and the Struggle for Supremacy বইয়ে বলা হয়েছে, দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে রয়েছে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ও নিজেদের ইসলামি রাষ্ট্রের আদর্শিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
হজ ব্যবস্থাপনা: ধর্মীয় বিরোধের দৃশ্যমান ক্ষেত্র
মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সমাবেশ হজ। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলমান সৌদি আরবে যান। ফলে হজ ব্যবস্থাপনা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৭ সালের হজে ইরানি হাজিদের রাজনৈতিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মক্কায় সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। রয়টার্সের তথ্যের ভিত্তিতে আলজাজিরার প্রকাশিত হজ-দুর্ঘটনার কালপঞ্জিতে বলা হয়েছে, ওই সংঘর্ষে প্রায় ৪০০ মানুষ নিহত হন, যাঁদের অধিকাংশই ইরানি হাজি।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানি বিপ্লবের পর দেশটির নেতৃত্ব হজকে মুসলিম বিশ্বের কাছে বিপ্লবী আদর্শ তুলে ধরার একটি ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করতে চেয়েছিল। অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষ হজের সময় রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও প্রচারণা নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেয়।
এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। ১৯৮৮ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং ইরান ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হজে অংশগ্রহণ বর্জন করে। ১৯৯১ সালে দুই দেশের সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়।
এই ঘটনা দেখায়, পবিত্র ধর্মীয় আয়োজনও কখনো রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
শেখ নিমরকে মৃত্যুদণ্ড: ২০১৬ সালে সম্পর্কের বড় অবনতি
সৌদি আরব ও ইরানের বিরোধের আরেকটি বড় ঘটনা ২০১৬ সালের জানুয়ারি। ওই মাসের ২ তারিখে সৌদি সরকার শিয়া ধর্মীয় নেতা শেখ নিমর আল-নিমরসহ ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
সৌদি সরকারের অভিযোগ ছিল, নিমর সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতায় জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে, তাঁর সমর্থক ও মানবাধিকারকর্মীরা তাঁকে সৌদি আরবের শিয়া জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে সোচ্চার একজন নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ইরানে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। ৩ জানুয়ারি বিক্ষোভকারীরা তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলা চালায়। এর পরদিন সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়।
রয়টার্সের ২০১৬ সালের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য গবেষণায় এ ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, শিয়া সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক অধিকার এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক: ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই
সৌদি-ইরান বিরোধ শুধু দুই দেশের সীমান্ত বা কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে দুই দেশ ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করেছে।
ইয়েমেন: ২০১৪ সালে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনের সংঘাত তীব্র হয়। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করে সামরিক অভিযান শুরু করে। ইরান হুথিদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগের মুখে পড়ে। তেহরান হুথিদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও তাদের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ নিজের নির্দেশে পরিচালিত হয়—এমন দাবি অস্বীকার করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুথিরা জায়দি শিয়া ধারার অনুসারী। তারা ইরানের দ্বাদশ ইমামপন্থি শিয়াদের মতো একই ধর্মীয় শাখার নয়। তাই শুধু শিয়া পরিচয়ের কারণে তাদের ইরানের সমজাতীয় বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক নয়।
সিরিয়া: গৃহযুদ্ধের সময় ইরান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে সমর্থন দেয়। সৌদি আরব বিরোধী পক্ষের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন করেছিল। ফলে সিরিয়ার যুদ্ধ দুই আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
ইরাক: ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানে সাদ্দাম হোসেনের সরকার পতনের পর ইরাকের রাজনীতিতে শিয়া দল ও গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ে। ইরান দেশটির বিভিন্ন শিয়া রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। সৌদি আরব ইরানের প্রভাব বৃদ্ধিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখে।
লেবানন: ইরান হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান সমর্থক। অন্যদিকে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও দুই দেশের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এবং ২০২৫ সালে Frontiers in Political Science-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এসব সংঘাতে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে প্রতিটি সংঘাতের পেছনে স্থানীয় ক্ষমতার লড়াই, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও কাজ করেছে।
সৌদি আরবের শিয়া সংখ্যালঘু এবং ইরানের সুন্নি জনগোষ্ঠী
ধর্মীয় বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থান।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিয়া মুসলমান বসবাস করেন। দেশটির তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর মধ্যে এই প্রদেশ অন্যতম। শিয়া জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৬ সালে শেখ নিমর আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ডের পর এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে, ইরানে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সুন্নি মুসলমানও বসবাস করেন। তাঁদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও স্থানীয় অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে দুই দেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি এক রকম নয়। তাঁদের জনসংখ্যা, সাংবিধানিক অবস্থান, স্থানীয় বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ধর্মীয় দ্বন্দ্বের আড়ালে আসল প্রতিযোগিতা কি ক্ষমতার?
সৌদি আরব ও ইরানের বিরোধ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকেরা প্রায়ই একটি বিষয়ে একমত হন—ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র কারণ নয়।
২০২১ সালে SAGE Open-এ প্রকাশিত ‘Structural Sources of Saudi–Iran Rivalry and Competition for the Sphere of Influence’ শীর্ষক গবেষণায় দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চারটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে: মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন, ভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর বিরোধটি ক্রমে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়।
২০২৫ সালে Cambridge University Press-এ প্রকাশিত ‘Battle of Sects? Iran and Saudi Arabia’s Role Conflict’ শীর্ষক গবেষণাতেও বলা হয়েছে, দুই দেশ রাজনৈতিক স্বার্থের প্রয়োজনে ধর্মীয় পরিচয় ও বক্তব্য ব্যবহার করে থাকে। অর্থাৎ ধর্মীয় মতাদর্শ বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি উপাদান, কিন্তু ক্ষমতা ও নিরাপত্তার হিসাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন: ধর্মীয় বিরোধ কি কমেছে?
দীর্ঘ বিরোধের পর ২০২৩ সালের ১০ মার্চ চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘোষণা দেয়। দুই দেশ দূতাবাস পুনরায় চালু করা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে সম্মত হয়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ত্রিপক্ষীয় বিবৃতিতে বলা হয়, ৬ থেকে ১০ মার্চ বেইজিংয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের আলোচনা শেষে এই সমঝোতা হয়। এর আগে ইরাক ও ওমানেও দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ২০২৪ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়, কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হলেও দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট ও গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইয়েমেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সম্পর্ক—এসব বিষয়ে বিরোধ পুরোপুরি মেটেনি।
অর্থাৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অর্থ ধর্মীয় মতপার্থক্য বা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অবসান নয়। বরং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রেখে আলোচনার পথ খোলা রাখার চেষ্টা।
সুন্নি-শিয়া বিরোধ, নাকি নেতৃত্ব ও আধিপত্যের লড়াই?
সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্বের ধর্মীয় ভিত্তি রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একদিকে সুন্নি-ওয়াহাবি ঐতিহ্য, অন্যদিকে দ্বাদশ ইমামপন্থি শিয়া মতাদর্শ; ধর্মীয় কর্তৃত্ব, ইমামত, ইসলামের নেতৃত্ব এবং পবিত্র স্থানগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে।
কিন্তু এই বিরোধকে কেবল ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে দেখলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। তেল ও জ্বালানি নিরাপত্তা, উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য, পারমাণবিক কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, ইয়েমেন-সিরিয়া-ইরাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্নও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৌদি আরব ও ইরানের বিরোধ মানেই বিশ্বের সব সুন্নি ও শিয়া মুসলমানের বিরোধ নয়। দুই সম্প্রদায়ের কোটি কোটি মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সামগ্রিক সংঘাত হিসেবে দেখলে ভুল বোঝাবুঝি ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
তাই সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের প্রকৃত চিত্র হলো—ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক বৈধতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা একে অন্যের সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী এক জটিল সংকট।
সূত্র:
- Council on Foreign Relations — The Sunni-Shia Divide
- United States Institute of Peace — Iran v Saudi Arabia: Islam’s Arch Rivals
- European Parliamentary Research Service — Iran-Saudi Arabia Relations
- Brookings — Groundhog Day in Mecca: Saudi-Iranian tensions
- Reuters — Saudi Arabia severs ties with Iran, January 2016
- SAGE Open — Structural Sources of Saudi–Iran Rivalry
- Cambridge University Press — Battle of Sects? Iran and Saudi Arabia’s Role Conflict
- China’s Ministry of Foreign Affairs — Saudi-Iran-China Joint Trilateral Statement, March 10, 2023
- International Crisis Group — Great Expectations: The Future of Iranian-Saudi Détente
- Al Jazeera/Reuters — Timeline: Hajj tragedies
বাইনান্সে বড় সাইবার হামলা, ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরি
নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা নাকি যুদ্ধ অনিবার্য নয়, সংবাদ মাধ্যমে চলছে বিতর্ক
ইকামত কী, কেন দেওয়া হয়? আজান ও ইকামতের পার্থক্য জানুন
ইরানের মসজিদে জুমার খুতবা কেমন হয়, কী বলেন ইমামরা?
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া ইরানের শীর্ষ ৮ ব্যক্তির কার কি দায়িত্ব?
জনপ্রিয় তারকা প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট আর নেই